উপন্যাস : তোমাকে চাই
লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা
পর্ব:২১
রিহানের কথায় নুসরাত না হেসে পারল না— তবে হাসির আড়ালে কিরিসের চোখের গভীর অস্থিরতা ধরা পড়ে যায়।নুসরাত হালকা হেসে নিজের অস্বস্তি ঢাকল।
কথা গড়িয়ে গেল অন্য দিকে— ভাই নেই প্রসঙ্গে হালকা হাসাহাসি, ঠাট্টা, কৌতুকের ঝাঁপি খুলে গেল।
হঠাৎ কিরিস গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল—
কিরিস — "তুমি কি চাও?"
নুসরাত চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক এনে বলল—
নুসরাত — "আমি চাই তুমি নাচো… তবে শর্ত আছে।"
কিরিস — (ভ্রু তুলে) "শর্ত?"
নুসরাত — "হ্যাঁ, কাপল ডান্স… এখানে থাকা যেকোনো মেয়ের সাথে। যদি তুমি আমার বড় ভাই হও—মানে, বড় ভাই বলে কথা—এতটুকু কথা রাখতে পারো, তাই না?"
কিরিস ঠোঁটের কোণে হালকা মুচকি হাসি টেনে চুপচাপ উঠে গেল।
রিহান অবাক হয়ে নুসরাতকে বলল—
রিহান — "আর কোনো শর্ত পেলে না? আজীবন এখানে বসে থাকতে—তাই বলে আর নাচ দেখতে হবে না, আর কোন মেয়ের সঙ্গে নাচবে শুনি!"
নুসরাত — "আরে নাচবে… আর এটা বলার কারণ হচ্ছে, আমিও দেখতে চাই কিরিস ভাইয়া কাকে বেছে নেয়। আমার জানামতে, আলতু-ফালতু কাউকে নেবেই না। যে নাচবে, সে নিশ্চিত স্পেশাল।"
রিহান — "স্পেশাল হলে কি হবে, আমি বুঝতে পারছি না।"
নুসরাত বিরক্ত হয়ে—
নুসরাত — "ঘোড়ার ডিম হবে! কিছু বোঝ না তুমি। আমাদের বেলাতেও তো কিছু বোঝোনি—আমি প্রপোজ করেছিলাম বলেই রাজি হয়েছিলে! আনরোমান্টিক কোথাকার!"
রিহান — "এই এই… তুমি ওদের জন্য এমন করছ কেন? আমি সব বুঝতে পেরেছি—স্পেশাল মানে অনেক স্পেশাল, তাই না? হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক আছে—এবার তো কথা বলো!"
নুসরাত — "মাঝে মাঝে আমার মনে হয়… বিয়ে করেছি কেন? আচ্ছা, যাই হোক—বিয়ে করে ভালোই করেছি।"
রিহান — "ওহ, এখন বুঝি মত বদলাচ্ছো?"
নুসরাত — "মিস্টার রিহান রায়চৌধুরী, এতোটুকু গ্যারান্টি আমি দিতে পারি—এই জীবন যখন আপনার সঙ্গে বেঁধেছি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই বাঁধন আমি খুলতে দেব না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আপনাকে এই নুসরাতের সঙ্গে সংসার করতে হবে।"
দু’জনের হাসি মিলেমিশে ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে।
ওদিকে, মেয়েরা এক কোণে দাঁড়িয়ে গল্পে মশগুল—হাসি-ঠাট্টায় পুরো পরিবেশ উজ্জ্বল। লিসিও হালকা কণ্ঠে তাদের সাথে কথা বলছে।
ঠিক তখনই, পিছন থেকে কিরিস এসে লিসির হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিল।
লিসি — "এই! কী করছেন? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?"
কিরিস — "কাপল ডান্স করবো।"
লিসি — "আরে! আপনার সাথে না—ইয়াবি ভাইয়ের সাথে! আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন কেন? ছাড়ুন!"
কিরিস — (গম্ভীর কণ্ঠে) "চুপ করো। একটা কথাও বলবে না।"
ওপাশে দাঁড়িয়ে ইয়াবি শুধু মুচকি হাসল। আজ সকালেই কিরিস তাকে বলেছিল—
"শেষ মুহূর্তে তুই স্টেজে উঠবি না—আমার জায়গা আমি নেবো।"
লিসি ইয়াবির দিকে তাকালে, ইয়াবি চোখে ইশারা করল—এডজাস্ট করো, লিসি।
লিসির মনে পড়ল, বিকেলে ইয়াবি যা বলেছিল…
কিরিস আর লিসি স্টেজে ওঠার আগেই ইয়াবি মাইক হাতে নিল—
ইয়াবি — "আপনাদের জন্য একটা স্পেশাল গিফট—এই অনুষ্ঠানের লাস্ট পারফরম্যান্স! লিসি আর কিরিস একসঙ্গে কাপল ডান্স করবে। তাই সবাই মনোযোগ দিন—না দিলে মিস করবেন এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ধামাকা!"
কিরিসের নাম শোনামাত্রই ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন—অবিশ্বাস, উত্তেজনা, বিস্ময়!
কিরিস নাচবে? তাও আবার মেয়ের সাথে?
আনোয়ার, আনারুল, সুপ্রিয়া, প্রিয়া—সকলেই স্টেজের কাছে চলে এসেছে। মির্জা বেগমের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি—এ দৃশ্য যেন তার মন ভরিয়ে দিল।
স্টেজে উঠল কিরিস আর লিসি। লিসির ভেতরে ভয় কাঁপছে—ইয়াবির সাথে ঠিক ছিল, কিন্তু এই ‘হিটলার’-এর সাথে? তাছাড়া প্র্যাকটিসও করেনি!
হঠাৎ কিরিস ঝুঁকে এসে বলল—
কিরিস — "চিন্তা করো না। তুমি যে স্টেপ প্র্যাকটিস করেছ—সেটাই করবে। বাকি সামলানো আমার দায়িত্ব, লিসি শর্মা।"
গানের বিট পড়তেই শুরু হল নাচ—
প্রথমে লিসির কিছুটা দ্বিধা ছিল, কিন্তু কিরিসের দৃঢ়, তবু মৃদু স্পর্শে সে ধীরে ধীরে ভেসে গেল সুরে।
প্রত্যেক স্টেপে কিরিসের নিয়ন্ত্রণ, আর লিসির ভরসা—একসাথে মিলিয়ে তৈরি হল এক মোহনীয় দৃশ্য।
গানের প্রথম বিট পড়তেই যেন প্রাঙ্গণের প্রতিটি আলো তাদের দিকে মাথা নত করল।
দর্শকদের মধ্যে ফিসফাস থেমে গেল, নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সবার দৃষ্টি আটকে গেছে—স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজন, যেন সুরের সম্রাট আর তার রাণী।
🎵 Tere warga taan mainu koi disda nahi, Main taan laya bada dil kithe lagda nahi, Tere rang da na mileya sitara mere yaara
সুর ভেসে উঠতেই কিরিসের চোখে সেই গভীর, অদম্য রাজকীয়তা—যেন পুরো মঞ্চের মালিক সে-ই। সাদা রঙের পোশাকে ওর অবয়ব এতটাই প্রভাবশালী যে আলোও যেন থমকে গিয়ে ওর অবয়বকে স্পর্শ করতে চায়। তার পাশে দাঁড়িয়ে লিসি—উজ্জ্বল শাড়ির ঢেউ আর গলার হার যেন রাতের আকাশে ছড়িয়ে থাকা চাঁদের আলো। গানের তালে তালে কিরিসের হাত ধীরে কোমরে গিয়ে থামে, এক ফোঁটা জোরও নেই, কিন্তু তাতে যে নিরাপত্তার বাঁধন তৈরি হয়, তাতে লিসির শ্বাসও যেন সুরের সাথে মিলিয়ে যায়।
ঘূর্ণির সাথে শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে গিয়ে আলো কেটে ছায়া ফেলে কিরিসের বুকে। চোখে চোখ পড়তেই তাদের মাঝে এমন এক বিদ্যুৎ খেলে যায়, যা চারপাশের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। দর্শকরা আর গান শুনছে না—শুধু দেখছে, আর মনে মনে ভাবছে, এটাই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
🎵 Pathavaikkum parvaikkaaraa poruthidiveeraa, Thodarndhu padhara seiveeraa, Hmmm… arara ray, Sikkavaikkum seigayellam niruthiduveeraa, Manasu iyangala seerraa
গান বদলালেও তাদের সুর বদলায় না। কিরিসের প্রতিটি মুভমেন্ট যেন ঘোষণা দিচ্ছে—এই নাচ কেবল একসাথে তারা দুজনেই করতে পারে। লিসির চোখে ঝিলিক, ঠোঁটে এক মৃদু হাসি—যেন প্রতিটি তালে সে হারিয়ে দিচ্ছে তার নিজের সীমানা, আর ঢুকে পড়ছে কিরিসের তৈরি এক স্বপ্নিল জগতে।
শেষ লাইনের দীর্ঘ টানে কিরিস ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসে—পৃথিবী যেন থেমে গেছে, বাতাস ভারী হয়ে আছে শুধু তাদের নিঃশ্বাসে। এক মুহূর্তের জন্য তাদের মুখ এত কাছে আসে যে, দূরত্ব বলতে কিছুই আর থাকে না—শুধু হৃদস্পন্দন, যা গানের শেষ তালের সাথে এক হয়ে বাজে।
গান থেমে গেলেও তাদের চোখ থামে না। করতালির ঢেউ উঠছে, প্রশংসার শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু তারা দুজন যেন এখনও ওই সুরের মধ্যে বন্দি—যেন পৃথিবী যতই এগিয়ে যাক, তারা এখনও দাঁড়িয়ে আছে সেই এক জাদুকরী মুহূর্তে, যেখানে আলো, গান আর ভালোবাসা এক হয়ে গেছে।গান শেষ হতেই হলজুড়ে করতালির ঝড় উঠল। চারপাশে উচ্ছ্বাসের শব্দ, কেউ দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছে, কেউ আবার বিস্মিত চোখে তাকিয়ে আছে—যেন বুঝতেই পারছে না, এই দুজনের একসাথে নাচ এতটা নিখুঁত হবে।
মাঝখানে কয়েকজনকে চোখে হিংসের ঝিলিক নিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল—তাদের চাহনিতে অদ্ভুত এক মিশ্রণ, প্রশংসার আড়ালে চাপা বিরক্তি। কারো ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি, আবার কারো দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে—যেন ভাবছে, এত প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য ওরা কেন হবে?
সমবয়সী মেয়েরা তো পুরো মুগ্ধ—মঞ্চ থেকে নামতেই লিসির দিকে ছুটে এলো জারা,
— “ফাটিয়ে দিয়েছিস বোন!”
— “আমরা তো ভাবছিলাম নাচ ভালো হবে, কিন্তু এটা তো পুরো ফিল্মি লেভেলের!”(সুরভী)
আরও আরোবি হেসে বলল,
— “এই লুকটা রাখিস, কিরিস ভাইয়ার সাথে আবার নাচতে হবে!”
কথার মাঝেই তাদের হাসি, হাত ধরা, গলায় জড়িয়ে ধরা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠল একেবারে উষ্ণ ও আনন্দময়।
কিরিস এদিকে খুব একটা মেলামেশায় নেই। নাচের প্রশংসা পাওয়ার পর শুধু মাথা নেড়ে হাসল, তারপর ধীরে ধীরে এক পাশে থাকা তার মায়ের দিকে এগিয়ে গেল। উৎসবের দায়িত্ব শেষ করে যেন এবার উপরে গিয়ে একটুখানি একা হতে চায়। পথ ভাঙতে ভাঙতে নিচের শব্দ ম্লান হয়ে এল, আর সে সোজা গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল।
— “মা, কফি বানিয়ে দাও তো।”
মা হাতের কাজ থেকে চোখ না তুলেই বললেন,
— “আরে, আমি ভুলে গেছি? বানিয়ে নিয়ে আসো, এত ভেজালের মধ্যে কফি আমি কিভাবে বানাবো বলো?”
কিরিস হালকা ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল।
মা আবার বললেন,
— “দেখছিস না আমি কাজ করছি? রান্নাঘরের দিকে মন দিতে হচ্ছে, আর তুই কফি কফি করছিস!”
গলার স্বর এবার একটু উঁচু হয়ে গেল,
— “একটা কাজ আছে, সেটা করতেই পারব না এখন—তুই নিজে বানিয়ে খাস, আমি বানা দিতে পারব না।”
হালকা এই রাগারাগির মাঝে কিরিস ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দ হাসি খেলিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল—এমনভাবে যেন জানে, মায়ের এই রাগ চিরকালই তার প্রিয় অভ্যাসগুলোর একটি।
নিচে কয়েকজন আত্মীয় দূর থেকে এই দৃশ্যটা দেখে হাসি চেপে ফেলল, কেউ কেউ কানে কানে বলছে,
— “মায়ের সাথে কিরিসের রাগারাগি? আহা, পুরনো গল্প আবার নতুন করে দেখলাম।”
আরেকজন মজা করে বলল,
— “এমন ছেলে ঘরে থাকলে মা কখনোই বোর হবে না।”
এই দৃশ্য দেখতেই কয়েকজন আবার জড়ো হয়ে গেল—কারো কৌতূহল, কারো ভালোবাসা, আবার কারো চাহনিতে নিঃশব্দ প্রশংসা—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন উৎসবেরই অংশ হয়ে গেল।
গার্ডেনের একপাশে বড় গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গল্পে মশগুল ইয়াবি, ঈশান, তূর্য, কাবির, আরোবি, সুরভি, রিহান আর নুসরাত।
তাদের হাসাহাসি, ঠাট্টা-মশকরা মিলিয়ে চারপাশ জমে উঠেছে।
হালকা শীতল বাতাসে মেয়েদের শাড়ির আঁচল উড়ছে, ছেলেদের চোখে সেই বিশেষ দুষ্টুমি—যেটা শুধু কাজিনদের আড্ডায় আসে।
ঠিক তখনই ভেতরের বারান্দা দিয়ে সুপ্রিয়া দ্রুত পা চালিয়ে গার্ডেনের দিকে এলেন, হাতে একগাদা কাপড় আর কিছু নোটপত্র। মুখে অস্থির ভাব—
—"আহা বাপরে! এই এত কাজের মধ্যে কেউ আমাকে পানি দিতে বলছে! আমি কি মানুষ নাকি, না কি সার্ভিস মেশিন? একবার কেউ কাজের প্রশংসা করলো না, শুধু আদেশ!"
সবাই মুচকি হেসে একে অপরের দিকে তাকালো, কারণ সুপ্রিয়া যখন এমন করে বলেন, তখন বোঝা যায়, বাড়ির সব কাজের চাপ আসলে তার ওপরই।
তিনি এসে ইয়াবিদের আড্ডার কাছে থামলেন।
—"দেখো তো, আমার এত দৌড়ঝাঁপের মধ্যে এখন আমাকে কিরিসের জন্য কফি বানাতে বলছে! আমি তো আর কিরিসের সেক্রেটারি নই।"
কথাটা যেন সোজা লিসির কানে গিয়ে বিঁধলো।
লিসি ভেতরে ভেতরে হালকা হাসলো।
সুপ্রিয়া একটু শ্বাস নিয়ে বলে —" তোদের মধ্যে কেউ একটু বানিয়ে দিবি,,, "
কথা টা বলার সঙ্গে সঙ্গে সবাই একটু আর চোখে তাকার লিসির দিকে। লিসি ভ্যপাপাচ্যাকা খেয়ে যায়,তখন তিশা হেসে বলে —“ সত্যি বলতে আমরা তো বানিয়ে দিতে পারি কিন্তু ভাইয়া মানে কিরিস কী আদেও খাবে। “
কাবির —" কথাটা সত্যি, মা একটা কাজ করো,, "
লিসির মনে হালকা শয়তানি খেলে গেলো। কিছু একটা ভেবে নিজের অজান্তেই মুচকি হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটে।
আরোবি তখনই সুযোগ নিয়ে সোজা হাত লিসির দিকে বাড়িয়ে দিলো—
আরোবি — “লিসি বানাবে। আমরা এখান থেকে যাচ্ছি না। তাছাড়া লিসি দারুণ কফি বানায়। একদিন আমাকে বানিয়ে খাইয়েছিলো—উফ! কি সুন্দর রং, কি গন্ধ! মনে হচ্ছে ভাইয়াও পছন্দ করবে। একটা কাজ কর, তুই বানাস।”
লিসি ভুরু কুঁচকে ঠাট্টার সুরে—
লিসি — “আমি না মানে… যদি খেয়ে মরে যায়?”
সুপ্রিয়ার মেজাজ আগেই খারাপ ছিল। এবার হেসে, একটু ঝাঁজের সুরে বলে উঠলো—
সুপ্রিয়া — “যাক, মরুক। কিন্তু এই যাত্রায় আমায় বাঁচিয়ে নিস।”
আর কথা না বাড়িয়ে লিসি সোজা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। মাথার ভেতর তখনো প্রতিশোধের চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মন-প্রাণ ঢেলে বানাতে লাগলো কফি। কাপ ভরতে ভরতেই ফিসফিস করে বলে উঠলো—
লিসি — “এত যত্নে, এত ভালোবেসে, এত সুন্দর করে বানাচ্ছি… মিস্টার কিরিস রায় চৌধুরী, আপনি খেয়ে বমি করতে করতে মরবেন। হা হা… লিসির সঙ্গে পাঙ্গা নিলে কপালেই দুঃখ আছে।”
চোখে একচিলতে শয়তানি হাসি নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠলো লিসি। কিরিসের ঘরের দরজা আধখোলা, হালকা টোকা দিতেই ভেসে এলো সেই গম্ভীর, গভীর স্বর—
কিরিস — “হুম… ভিতরে আসো।”
ভিতরে ঢুকতেই লিসির খেয়াল হলো—এই অল্প সময়েই কিরিস তার পাঞ্জাবি বদলে ফেলে কমফোর্টেবল টি-শার্ট আর ট্রাউজারে চলে এসেছে। চুলগুলো এলোমেলো, তবু অদ্ভুত আকর্ষণীয় লাগছে তাকে। রাজকীয় রূপ যেনো আরো বাড়িয়ে তুলেছে এই অগোছালো ভঙ্গি।
ডিভানে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসে, হাতে ফোন নিয়ে যেনো কিছু কাজ করছে। পাশে কয়েকটা ফাইল ছড়ানো—মনে হয় কাজের ব্যস্ততার মাঝেই উপরে উঠে এসেছে।
লিসি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটা রাখলো কিরিসের পাশে।
কিরিস একবারও ওর দিকে তাকালো না। শুধু কাপটা তুলে নিয়ে ঠোঁটে চুমুক দিলো—
ঘরের নীরবতা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠলো।
লিসি অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে—কখন কিরিস কাপ নামিয়ে বলবে, “এই কফিটা কে বানিয়েছে? আমার তো বমি পাচ্ছে…”
মুখে মচুকি মচুকি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ও।
কিরিস কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে মুহূর্তেই বুঝলো—এটা তার মায়ের হাতের কফি নয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, স্বাদটা তার নিজের রুচির সঙ্গে একেবারে মিলে যাচ্ছে। এতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছে না, বরং মনে মনে কৌতূহল জমছে—“কে বানালো এটা?”
এতক্ষণ লিসিকে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবশেষে কপিটা পাশে নামিয়ে রেখে মুখ তুলে তাকালো ওর দিকে।
লিসির চোখে ঝিলিক খেলে গেলো। ভেবেই নিলো—এবার বুঝি বলবে, “আমার বমি পাচ্ছে…”
অপেক্ষা না করে নিজেই হঠাৎ বলে উঠলো—
লিসি — “কি হলো ভাইয়া? আপনার তো বুঝি বমি পাচ্ছে? মনে হচ্ছে এবার মরে যাবেন, তাই না?”
কিরিস ভুরু কুঁচকে তাকালো ওর দিকে।
কিরিস — “মানে কি? বমি হবে কেন? বরং অবাক হচ্ছি… কফিটা আমার স্বাদের সঙ্গে যাচ্ছে। অদ্ভুত… এই কফিটা কে বানালো?”
লিসি ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভঙ্গিতে উত্তর দিলো—
লিসি — “আমি! তাই বলছি—আরও খারাপ লাগছে তাই না? ভয় করছেন মনে হচ্ছে, বমি করতে করতে মরে যাবেন।”
কিরিস ধীরে ধীরে গম্ভীর হলো।
কিরিস — “ব্যাপারটা কি? আমার মরণে এত আনন্দ পাচ্ছো কেন? আমি মরে যাব কিনা সেটা সময় বলবে, কিন্তু কেন বমি করবো? আমি তো একদম ঠিক আছি।”
লিসি দাঁত চেপে বললো—
লিসি — “ঠিক আছেন মানে কি? আপনাকে বমি করতে হবেই, আর মরতে হবে… না হলে আমার প্রতিশোধ আমি নেব কি করে?”
কিরিস হঠাৎ থমকে গেলো।
কিরিস — “কি বললে?… তুমি আমার মৃত্যু কামনা করছো, লিসি শর্মা? এখন বুঝতে পারছি কেন এসব বলছো… কিন্তু তুমি আমার ঘরে এসেছো কেন?”
রাগে কাঁপতে কাঁপতে সব বলে ফেললো লিসি। আর তখনই কিরিসের মুখে ধরা দিলো এক অদ্ভুত মুচকি হাসি। সেই হাসি এতটাই ঘন আর মোহনীয় যে লিসি এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলো। মনে হলো যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অথচ সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটা সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিরিস আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালো।
লিসি তখনই হুঁশে ফিরে গেলো। ভেবেই নিলো—এখানে বেশি সময় দাঁড়ালে তার কপালে দুঃখ আছে। তাই সরে যেতে চাইলো।
কিন্তু হঠাৎই পেছন থেকে একটা শক্ত হাত খপ করে তার কব্জি চেপে ধরলো।
চোখ বড় বড় করে ঘুরে তাকাতেই দেখে—কিরিস।
ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই মুহূর্তে ওকে টেনে এনে এক ঝটকায় ফেলে দিলো বিছানার উপর।
লিসি কিছু বলার আগেই কিরিস ঝুঁকে দু’হাত শক্ত করে খাটে পিন করে ধরলো। এবার আর নড়ার উপায় নেই।
লিসি — “এই… এসব কি করছেন আপনি? সরুন… আমি কিন্তু চিৎকার করবো। ছেড়ে দিন আমাকে!”
কিরিস মুখটা একেবারে কাছে এনে ফিসফিস করে বললো—
কিরিস — “কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমাকে কফি খাইয়ে মারতে চেয়েছো, তাই না? তার শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে… অবশ্যই।”
লিসি — “না না! আমি তা বলিনি… মানে ওইটা না… আমি তো—আহ! বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে… কেন ছাড়ছেন না?”
কিরিস ঠান্ডা স্বরে বললো—
কিরিস — “চিৎকার করতে পারো, কেউ শুনবে না। বাইরে গান-বাজনা চলছে, আর আমার ঘরটা সাউন্ডপ্রুফ। এখানে তুমি মরলেও কেউ টের পাবে না… লিসি শর্মা।”
লিসির গলাটা শুকিয়ে এলো। ফিসফিস করে বললো—
লিসি — “এসবের মানে কি?… আপনি কে আমার? কোন অধিকারে এভাবে ছুঁয়েছেন আমাকে? বলুন তো…”
কিরিস মুখটা কাছে এনে ধীর গলায় বললো—
কিরিস — “কেন আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড হবো না? আমরা তো ডেট করছি, তুমি জানো না?… আর একটুখানি যদি নড়ো, তুমি চুপ করে থাকবে এভাবেই।”
কিরিসের কথার তোয়াক্কা না করে লিসি হাত-পা ছুঁড়ে নড়াচড়া করতে লাগলো। শক্ত করে কচলাতে লাগলো কিরিসের দু’হাত।
কিরিস এবার আর কিছু না ভেবে হঠাৎ নিজের পুরো ভর লিসির উপর ফেলে দিলো।
আচমকা এমন চাপ পড়ায় লিসির শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো। বুকটা দমবন্ধ হয়ে আসছে, শরীর নাড়াতে পারছে না, একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুধু চোখের ভাষায় বোঝাতে চাইছে—“ছাড়ুন আমায়…”
চোখের কোনায় বিন্দু বিন্দু পানি জমে উঠলো। গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, কিন্তু ভয়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত আবেগ মিশে যাচ্ছে।
কিরিস নরম অথচ গম্ভীর স্বরে বললো—
কিরিস — “এভাবে ভয় পেয়ো না লিসি শর্মা… চিন্তা করো না। তুমি বলেছিলে আমি যদি লিমিটের মধ্যে থাকি, তুমি আমাকে একটা গিফট দেবে। আমি সেই লিমিটেই আছি। আমার এখন একটা কিস চাই। চাই মানে… তুমি না দিলেও আমি জোর করে নিতে পারি। এটা কমন বিষয় গার্লফ্রেন্ড আর বয়ফ্রেন্ডের মাঝে, তাই না?”
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে—এই গিফট ওর একেবারেই ভালো লাগছে না। তবু কোনো কথাই মুখ দিয়ে বেরোলো না।
কিরিস আর সময় নষ্ট করলো না। ধীরে ধীরে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো লিসির ঠোঁটে।
কোনো জোর নেই, বরং এক অদ্ভুত কোমলতা… ধীরে ধীরে কিস করতে লাগলো ওকে।
কিন্তু যতই সময় গড়ালো, ততই কিরিস বেসামাল হয়ে পড়লো। চুমুগুলো হয়ে উঠলো প্রখর, গভীর, জ্বলন্ত।
লিসির আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল গুঁজে শক্ত করে ধরে রাখলো ওর হাত, যেন কোনোভাবেই পালাতে না পারে।
লিসি এদিক-ওদিক নড়ে বাঁচতে চাইলেও কিরিসের গ্রিপ আরো শক্ত হলো।
শেষমেষ কিরিস নিজেই বুঝলো—ওর প্রতিরোধে আর চাপানো ঠিক হবে না। ধীরে ধীরে ওর ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে উঠে বসলো পাশে।
লিসি তখনো থ হয়ে শুয়ে আছে। বুকের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে, মাথার মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। রাগে, লজ্জায়, অভিমানে ও প্রায় কেঁপে উঠছে। উঠে পড়তে চাইলো।
পেছন থেকে কিরিসের গলা বাজলো—
কিরিস — “আজীবন মনে রেখো শাস্তির কথা। এই ভুল যেন জীবনে আর কখনো না করো। আজ তো শুধু kissর মধ্যে দিয়ে ছেড়ে দিলাম… কিন্তু পরের বার— কিন্তু আমি বাচ্চা না নেওয়া পর্যন্ত ছাড়বো না।”
ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তেই জমাট বেঁধে গেলো।কিরিসের এমন লাগামহীন, বেপরোয়া কথা শুনে নিশির গাল দুটো মুহূর্তেই রঙ ধরল লাল টকটকে। লজ্জা আর রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে গর্জে উঠল—
নিশি — "কি সব আজেবাজে বলছেন আপনি! লজ্জা বলে কিছু নেই? নির্লজ্জ নাকি একেবারে বেয়াদব কোথাকার!"
কিরিস ঠোঁটের কোণে একরাশ ব্যঙ্গভরা হাসি টেনে নির্লিপ্ত গলায় বলল—
কিরিস — "হুম… হ্যাঁ, ভীষণ নির্লজ্জ আমি, ভীষণ পরিমাণে। সেটা তুমি নিজেই জানো না এখনও।"
লিসি দাঁত চেপে দম ফাটানো কণ্ঠে বলে উঠল—
লিসি — "আপনি… আপনি! আহ্ আপনার সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই!"
কিরিস একপলকও চোখ না সরিয়ে ঠান্ডা অথচ অদ্ভুত দৃঢ় গলায় জবাব দিল—
কিরিস — "কে বলল? আমরা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড। সম্পর্ক নেই কোথায়? আমরা তো ডেট করছি… আর এসব তো খুবই কমন বিষয়। তাই না?"
লিসির বুক কাঁপতে লাগল, রাগে তার চোখ ভিজে উঠল। সে চিৎকার করে বলল—
লিসি — "কমন বিষয়? এটা কোনোদিনও কমন বিষয় হয় না! আর বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সম্পর্ক? আমি এখুনি ব্রেকআপ করছি আপনার সাথে, শুনতে পাচ্ছেন? এখুনি!"
কিরিস সামান্য ঝুঁকে, ধীরে ধীরে চোখ সরু করে ঠান্ডাভাবে বলল—
কিরিস — "তা হলেও হবে না… কারণ আমি তো করিনি। তুমি একতরফা করলে তো হয় না, তাই না?"
লিসির মস্তিষ্ক যেন ফেটে যাবে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে গিয়ে সে দুহাত মুঠো করে কেঁপে কেঁপে বলল—
লিসি — "আহ্! আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি! মরন… এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি বেয়াদব লোক কোথাকার!"
বলেই আর এক সেকেন্ড দেরি না করে ঘটকাট করতে করতে সরে গেল। আর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিস? ঠোঁটে অশ্লীল এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তার চোখে যেন লুকিয়ে ছিল রহস্যময় দখলদারির ঝলক—যেন লিসিকে সে নিজের করে নিয়েছে আগেই।
গার্ডেনে তখনও আলো-ঝলমলে অনুষ্ঠান চলছিল, গল্পগুজব, হাসাহাসি, খাওয়া-দাওয়া। কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে সবার ভিড় ছুটে গেল অন্যদিকে। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া গার্ডেন একেবারে নিরিবিলি হয়ে পড়ল। রায়চৌধুরী বাড়ি তখনো মাতোয়ারা নিজেদের হৈচৈয়ে।
রিহানের ঘর সাজানো হয়েছে রঙিন ফুলে, সাজসজ্জার সেই ঘ্রাণে পুরো বাড়ি মাতাল হয়ে আছে। হাজার রকমে সবাই মজা করে, খোঁচা মেরে রিহানের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে মোটা টাকা। হাসির শব্দে আকাশ মাথায় তুললেও, সেইসব ভিড়ের মাঝখানে কিরিস একবারও আর নিচে নামল না।
লিসিও বুঝে গিয়েছে—তার জীবনটা এখন বাঁধা পড়ে গেছে এমন একজনের সাথে, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। খানিক আগের দৃশ্যটা তার মাথায় আসতেই শরীর কেঁপে ওঠে। না, ভাবা যাবে না। যত বেশি ভাববে, ততই যেন সেই মুহূর্ত তার ভেতরটা কুরে কুরে খাবে। তাই জোর করে সবকিছু মুছে ফেলতে চেষ্টা করছে।
রাত গভীর হতেই একে একে সবাই নিজ নিজ কক্ষে ফিরে গেল। দিনের ক্লান্তি শেষে শুয়ে পড়তেই যে প্রশান্তি মেলে, তা আর কোথাও নেই। রায়চৌধুরী বাড়ি ধীরে ধীরে নিস্তব্ধতার ভেতরে হারিয়ে গেল।
আজকের বিয়ের সব আয়োজন শেষ, হাসি-কান্না, ঠাট্টা-তামাশা সবই ইতিহাস হয়ে গেল।
কাল ভোরে উঠবে এক নতুন সকাল—এক নতুন জীবনের শুরু রিহান আর নুসরাতের জন্য।
ভোরের প্রথম আলোটা যেন আস্তে আস্তে ঘুমন্ত রায়চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি কোণে ঢুকে পড়ছে। রাতভর উৎসব, হৈচৈ, হাসি-ঠাট্টা, গান-বাজনার পর আজ সকালের হাওয়া কেমন যেন একেবারে ভিন্ন। পাখির কিচিরমিচির শব্দে চারদিক ভরে গেছে, ফুলে ভরা বাগানের উপর রোদের সোনালি আভা পড়তেই মনে হচ্ছে প্রকৃতিই যেন নতুন করে বিয়ে বাড়ির আনন্দকে আশীর্বাদ করছে।
বাড়ির উঠোনে সাদা কুয়াশার পর্দা এখনও টিকে আছে, তার ভেতর দিয়ে যখন সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে তখন সবকিছু কেমন রহস্যময়, অথচ শান্ত লাগছে। বারান্দার এক কোণে রাখা ফুলদানিগুলো থেকে হালকা গন্ধ ভেসে আসছে, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু হাওয়ায় দুলে দুলে মুক্তার মতো ঝিকমিক করছে।
ভোরের এই আবেশে চারপাশ যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। কাল রাতের সঙ্গীত, হাসি আর কোলাহলের ধ্বনি মিলিয়ে গিয়ে এখন কেবল পাখির ডাক আর সকালের নীরবতার মিষ্টি সুর বেজে চলেছে। ধীরে ধীরে বাড়ির লোকজন জেগে উঠছে, কেউ রান্নাঘরে ঢুকছে সকালের নাশতার আয়োজন করতে, কেউ আবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে টলমল চোখে সকালের ঠান্ডা বাতাস খাচ্ছে।আজ নতুন একটা দিন—রিহান আর নুসরাতের জীবনে একেবারে অন্যরকম শুরু। সেই শুরুর সাক্ষী হয়ে রইল এই রঙিন সকাল, ফুলে ভরা বাগান আর প্রভাতের শান্ত রোদ্দুর।
সকাল হতেই আবার জীবন্ত হয়ে উঠে রায় চৌধুরী বাড়ি।
প্রভাতের আলোয় প্রাসাদের মতো বিশাল বাড়িটার প্রতিটি কোণ যেন ঝলমলিয়ে উঠেছে।
রান্নাঘরে সুপ্রিয়া আর প্রিয়া—বাড়ির দুই বৌমা—নিজেদের মতো করে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সবার জন্য হালকা নাস্তার আয়োজন নিয়ে।
বাড়ির বয়স্ক আত্মীয়রা ভোরে উঠে যে যার গন্তব্যে রওনা দিয়েছে—দূর পথ বলে সকালেই বের হয়ে গেছে সবাই।
এখন বাড়িতে রয়ে গেছে মূলত ছেলেমেয়ের দল, আর একেবারে আপনজনেরা।
বাইরের বাগানে বসে আনোয়ার, আনারুল আর মির্জা বেগম সকালের ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মেখে কুশল বিনিময়ে মেতে আছে।
বাড়ির ভেতরে লিভিং রুমে ছেলেমেয়েরা ইতোমধ্যেই জমিয়ে বসেছে।
আরোবি হাই তুলে হঠাৎ বলে উঠলো—
—"অবশেষে দ্য ব্রাদার রিহানের ওয়েডিং শেষ! ওহ্ হাউ লং টাইম লাগল!"
তার ভাঙা ইংরেজি শুনে সুরভী ভুরু কুঁচকে বললো—
—"তোর কি মুখ একটুও থির থাকতে পারে না? এত পড়াশোনা করিস, তারপরও এইভাবে কথা বলিস কেন!"
আরোবি কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে—
—"আরে বাদ দে তোরা। আমি যেমন খুশি তেমন বলব। যে যা মনে করবে করুক!"
ইশান মুচকি হেসে যোগ দিল—
—"আমার মনে হচ্ছে একটু পরে তোর ডাক পড়বেই…"
ইয়াবি অবাক হয়ে তাকিয়ে—
—"ডাক পড়বে? কে ডাকবে?"
ইশান ফিসফিস করে—
—"হাসপাতাল!"
কথাটা শুনে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
এমন সময় তিশা বললো—
—"আচ্ছা, লিসি এখনো ঘুম থেকে উঠলো না কেন?"
লিজা হেসে উত্তর দিল—
—"হয়তো খুব ক্লান্ত ছিল, তাই এতক্ষণ ঘুমাচ্ছে।"
এইসব আড্ডার মাঝেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখা গেল রিহান আর নুসরাতকে।
নুসরাতের চুল খোলা, ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে।
বুঝাই যাচ্ছে সদ্য স্নান সেরে এসেছে।

0 Comments