তোমাকে চাই
লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা
পর্ব:২০
তূর্য—"প্রথমত, আমার জীবনে কোনো প্রেম আসেনি। দ্বিতীয়ত, খুঁজিওনি। তৃতীয়ত, কাজ এত থাকে যে প্রেম তো দূরের কথা, বিয়ের কথাই মনে পড়ে না। তবে লিসি, যদি তুমি মেয়ে দেখে দাও, তাহলে বিয়ে করতে পারি।"
লিসি হেসে—"সত্যি? তাহলে তো আজ থেকেই মেয়ে দেখা শুরু করতে হবে!"
সবাই এত কথা বললেও, সুরভী এক কোণে বসে বই পড়ছে। সেটাও আবার উপন্যাস। বড্ড বইপোকা সে—কিন্তু আসল বউ না, উপন্যাসের পাতাতেই ডুবে থাকে।
আরোবি এগিয়ে এসে—"আচ্ছা, তুই ডান্স শেষ করেই বই পড়ছিস? কি পড়ছিস?"
তারপর নিজেই হাত তুলে—"আচ্ছা, বাদ দে।"
সুরভী বই নামিয়ে—"সিরিয়াসলি পড়ছি। ডিস্টার্ব করিস না। আর ডান্স পার্টনার আমার লাগে না, তাই চিন্তা করিস না।"
তিশা এবার কাবিরের দিকে—"কাবির, আমরা নিচে যাচ্ছি।"
কাবির—"হুম, যাও। আর শোন, আমার মোবাইলটা চার্জে দিয়ে দিও।"
তিশা ফোন হাতে—"আরে, এবার চল! সবাই সাজগোজ শুরু করবি। মেকআপ আর্টিস্ট চলে এসেছে—আমাদের তো আবার টাইম লাগে!"
তিশার কথা মতো সবাই নিচে নেমে যায়। ছাদে থাকে শুধু ছেলেরা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। সূর্য ডুবে যাওয়ার মুখে, গোধূলির লাল-কমলা আভা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হালকা মৃদু বাতাস বইছে ছাদের ওপর দিয়ে, ছেলেরা ফিসফিস করে গল্প করছে।
গার্ডেনে আলো জ্বলে উঠেছে, স্টেজের চারপাশে ঝলমলে সাজ। বর ও কনের বসার জায়গা আলাদা করে সাজানো হয়েছে, আর তার সামনে বড় স্টেজ—সেখানে হবে পারফরম্যান্স।
অতিথিরা আসা শুরু করেছে। মেয়েদের দিকে তাকালে দেখা যায়, সাজগোজে ব্যস্ত সবাই। নুসরাতকে আলাদাভাবে সাজানো হচ্ছে—সময় নিয়ে, যত্ন করে। ছেলেদেরও পোশাক বদলে, চুল ঠিক করে নিচে পাঠানো হচ্ছে। কেউ ককটেল হাতে, কেউ গরম জিলাপি খাচ্ছে। খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হয়ে গেছে।
রাত ঘনিয়ে আসতেই রায়চৌধুরী বাড়ি সেজে উঠল আলোয়—অতিথিদের আনাগোনা বাড়ছে। নুসরাতের বাড়ি থেকেও বাবা-চাচারা একে একে এসে পৌঁছালেন।
গার্ডেন যেন রঙের উৎসব—
চারদিকে ঝলমলে ফেয়ারি লাইট, ফোটা ফুলের গন্ধে ভরা বাতাস, আর হাসি-ঠাট্টার মিষ্টি শব্দে মিশে আছে সন্ধ্যার উষ্ণতা। মেয়েরা সবাই একসাথে গোল হয়ে বসে আছে, হাতে গ্লাসে জুস, চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক। কারও হাসি চাপা, কারও আবার পুরো গলা খুলে; যেন কেউ থামতে বললেও থামবে না।
আরোবি হঠাৎ লিসির দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলে—
—"এই লিসি, আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে সাউথ ইন্ডিয়ার নায়িকা। হাফ লেহেঙ্গা শাড়ি পরে একদম ফিল্মি মুডে আছিস!"
লিসি হেসে উত্তর দেয়—
—"যেহেতু গান সাউথ ইন্ডিয়ার, ভাবলাম এই শাড়িটাই পারফেক্ট হবে। আর আমি তো দাদুবাড়ি গেলে এমন করেই শাড়ি পরি।"
চারপাশে আত্মীয়-স্বজন, বড়রা, ছোটরা—সবাই যার যার মতো মেতে আছে। ছেলে-মেয়েরা নিজেদের মধ্যে গল্প, কৌতুক, সেলফি... ঠিক তখনই অনুষ্ঠানে আসে রিহান আর নুসরাত।
রিহান সাদা শার্টের ওপর কালো স্যুট—একদম ক্লাসিক লুক। নুসরাত মেরুন শাড়িতে সোনার গহনা, বাড়াবাড়ি কিছু নয়—যতটুকু পরলে রুচিশীল দেখায়। ওদের দেখে ভিড়ের চোখ এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, তারপর ধীরে ধীরে করতালিতে ভরে ওঠে পরিবেশ। তারা গিয়ে বসে, আশীর্বাদ আর উপহার নিতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর গেটের দিকে হালকা আলো পড়ে—একটা গাড়ি ঢুকছে।
দরজা খুলে কিরিস নামে।
আজ তার পরনে নেই কোনো স্যুট বা শার্ট-প্যান্ট—পরেছে সাদা পাঞ্জাবি, তার ওপর হালকা সোনালি টাচের কাজ করা,, চুলে হালকা স্টাইল, মুখে সেই গম্ভীর অথচ আকর্ষণীয় ভাব।
গার্ডেনে ঢুকতেই কয়েকজন আত্মীয় চাপা হেসে ফিসফিস করে—এই রূপে কিরিসকে আগে দেখেনি কেউ।
লিসির চোখও অজান্তে বড় হয়ে যায়। এই লুকটা... ঠিক যেন সিনেমার হিরো।
আরোবি তখন কাবাবের শিক হাতে, গরম ধোঁয়া উড়ছে, এক টুকরো গরুর মাংস গালে পুরে বলতে থাকে—
—"দেখিস লিসি, তোদের জামা রঙ একদম মিলে গেছে!"
লিসি চমকে তাকায়—সত্যিই তো, রঙে অদ্ভুত মিল। কিছু বলার আগে নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে যায়—"তো কি হয়েছে? হতেই পারে।" তারপর মুখ ফিরিয়ে বলে—
—"তুমি থাকো এখানে, আমি নানুর কাছে যাচ্ছি।"
মির্জা বেগম তখন রান্নাঘরের একপাশে দাঁড়িয়ে, হাতে মিষ্টির পাত্র সাজাচ্ছে।
—"কি হয়েছে, লিসি? কিছু লাগবে?"
—"না নানু, শুধু দেখতে এলাম তুমি কি করছো।"
মির্জা হেসে একটা পাত্র হাতে দেয়—
—"এইটা বড় মামির কাছে দিয়ে আয় তো।"
লিসি পাত্র হাতে এগিয়ে যায়। দেখে সুপ্রিয়া বড় হাঁড়িতে রান্না করছে, পাশে গরম ভাপ উঠছে।
—"মামি, এত বড় হাঁড়িতে কি বানাচ্ছো? আর এখানে বুফে সিস্টেম তো আছে, আলাদা রান্নার কি দরকার?"
সুপ্রিয়া মুচকি হেসে বলে—
—"বাড়ির বড় বউ বলে কথা! অতিথিদের—বিশেষ করে নুসরাতদের বাড়ির বয়স্ক মানুষদের—আমরা আমাদের হাতে রান্না করে খাওয়াই, এই বাড়ির নিয়ম।"
হাঁড়ির ধারে দাঁড়াতে গিয়ে তার হাতে থাকা ভারী সোনার চুরি বারবার ঠোক্কর খাচ্ছিলো ধাতব কড়াইয়ে। বিরক্ত হয়ে বললো—
—"ওফ্! লিসি, এই চুরিদুটো তোর কাছে রাখ, পরে নেবো।"
লিসি হাত বাড়িয়ে নিলো—
—"আমি হাতে পরেই রাখি, নাহলে হারিয়ে যাবে।"
সুপ্রিয়া মাথা নাড়লো—
—"হুম, এইটা কিন্তু এক পিস।"
লিসি চুরি পরে নিলো—মনে হয়নি, কিন্তু এই চুরি আসলে এই বাড়ির বড় বউয়ের প্রতীক, যেটা একদিন কিরিসের বউয়ের হাতে যাবে।
আরোবি তখনই ডাক দিলো—
—"এই লিসি, চল! সামনে সবাই জড়ো হচ্ছে।"
গিয়ে দেখে স্টেজের সামনে লোক ভিড়। আলো-ঝলমল, মাইকে ইয়াবি দাঁড়িয়ে। পাশে তূর্য, মুখে দুষ্টু হাসি।
—"সবাই মনোযোগ দিন! আমরা আপনার সময় নষ্ট করবো না, কিন্তু বরাবরের মতো এবারও আমাদের একটা ছোট ডান্স পারফরম্যান্স হবে। ছেলে-মেয়েরা আলাদা দল, প্রতিযোগিতা জমবে—এইবারের রিসেপশন আমরা শুরু করছি রিহান আর নুসরাতের জন্য!"
ভিড় করতালিতে ফেটে পড়ে—রাত যেন এখনই শুরু হতে চলেছে।
ইয়াবির মাইকে বলা অল্প কিছু কথা যেন পুরো গার্ডেনের সবার মন কেড়ে নিলো। মুহূর্তের মধ্যেই সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে—চোখে উচ্ছ্বাস, মুখে হাসি। যেন এই নাচ দেখার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলো সবাই।
আর হবে না-ই বা কেন?
ওরা প্রত্যেকে সাজগোজ করেছে মন দিয়ে, নাচের স্টেপগুলো প্র্যাকটিস করেছে বহুবার—কেউ কারও থেকে কম নয়। এমন এক পরিবেশ, যেখানে প্রতিটি হাসি, প্রতিটি স্টেপ, প্রতিটি ঘুর্ণন যেন অতিথিদের আনন্দে ভরিয়ে দেবে।
তবে আজকের ডান্স পারফরম্যান্সের নিয়ম আলাদা—
মঞ্চে “কপাল ডান্স” বললে বোঝানো হচ্ছে শুধু ইয়াবি আর লিসিকে। এ নাচে অন্য কেউ যোগ দেবে না। সময় কম, কিন্তু আনন্দ হবে অনেকগুণ বেশি।
আসলে, আগে থেকেই কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে—নাচের সময় বেশি টানা যাবে না। কারণ মাঝখানে সবার আলাপ, কুশল বিনিময়, গল্পগুজব—সবই জমে থাকা চাই। তাই পারফরম্যান্স ছোট হবে, কিন্তু প্রভাব হবে গভীর।
আজকের রিসেপশন যেন এক অদ্ভুত মিশ্রণ—চমক হয়তো কম, কিন্তু আনন্দে কোনো কমতি নেই। গানের তালে তালে নাচ, তারপর খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, আর শেষে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান সমাপ্তি—সব মিলিয়ে গার্ডেনের প্রতিটি বাতাসে এখন শুধু উচ্ছ্বাস আর প্রত্যাশার গন্ধ।
স্টেজের ওপর ঝলমলে লাইট, চারপাশে হাসি-আনন্দে গমগমে বিয়েবাড়ি।
কিন্তু প্রশ্ন একটাই—কে নাচবে আগে?
মেয়েরা আর ছেলেরা দু’পক্ষই একে অপরের চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল,
ঠিক তখনই—
হঠাৎ লাইট অফ!
অন্ধকার নামতেই ভিড়ের মধ্যে চাপা গুঞ্জন—
"কি হতে চলেছে?"
হালকা কুয়াশার মতো ধোঁয়া ভেসে বেড়ায় মঞ্চে, সাউন্ডবক্সে গানের মৃদু সুর শুরু হয়।
হঠাৎ স্পটলাইট জ্বলে ওঠে, দুই পাশে দাঁড়িয়ে দুই দল, আর উপর থেকে সবকিছু উপভোগ করছে বর-বউ—আজকের সব আয়োজনই তো তাদের জন্য!
গানের প্রথম বিট বাজতেই সবাই চুপ,
কিরিস কারো দিকে না তাকিয়ে দাঁড়াল, তার চোখ শুধু এক জায়গায়—তার নির্দিষ্ট মানুষটিকে খুঁজে বের করতে…
♪ সংসার সুখী হও রমনীর গুণে
আজকের মেয়েরা কি সেই কথা মানে
ফুটোটা নাড়ে না যে, শরীরে মেদ বাড়ে
সকালে যায় জিমে, দুপুরে পার্লারে
রাতে মেগা সিরিয়ালে ডুব দিতে জানে... ♪
ছেলেরা হেসে ওঠে, মঞ্চের ডানদিক থেকে আরোবি বলে—
— "তোদের মুখে মানালো না, আরে এবার আমাদের দেখ!"
বিট বদলাতেই মেয়েরা কোমর বেঁধে মঞ্চে নামে—
এক্সপ্রেশনে ভরা চোখ, নিখুঁত স্টেপ, গানের লাইন দিয়ে ছেলেদের কথার জবাব দিচ্ছে নাচের মধ্যেই।
ছেলেরা দাঁড়িয়ে চুপচাপ দেখছে, মুখে কৌতূহলের হাসি।
♪ সংসারে সুখ আসে মোটা ইনকামে
মেয়েরা যে তাই ছোটে অফিসের কামে
ছেলেরা বড় খোড়ে, মুখে পাপেলা ঝরে
ঘুমিয়ে খেলা দেখে, অকালে ভূড়ি বাড়ে
মিছে দোষ দেয় শুধু মেয়েদের নামে... ♪
হলভর্তি মানুষ হেসে গড়িয়ে পড়ছে—
গান, নাচ, খুনসুটি—সব মিলে এক মজার ঝগড়া।
একটু আগের ‘ছেলে বনাম মেয়ে’ দ্বন্দ্বের জায়গায় এখন হাসি আর হাততালি।
কিছু দর্শক পাশ থেকে বলছে—
"এদের কোনো গ্যারান্টি নেই, একটু আগে ঝগড়া করছিল, এখন দেখো মিশে যাচ্ছে... পরে আবার ঝগড়া করবে! তবে আমরা মজা পাচ্ছি ভীষণ।"
ছেলেরা একটু হাঁপাচ্ছে, মেয়েদের এনার্জি এখনও টগবগে।
তখনই সুরভী এক পা এগিয়ে এসে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়—
— "এখন তোদের মধ্যে থেকে একজন নাচবে আর আমাদের মধ্যে থেকে একজন নাচবে। যে জিতবে, তার জন্য থাকবে আকর্ষণীয় পুরস্কার। রাজি তো, মিস্টার ছেলেরা?"
তূর্য মাইক্রোফোন কাড়ে—
— "মিস মেয়েরা, ছেলেরা যদি রাজি না হয় তাহলে গাধারা রাজি হবে নাকি? আমরা রাজি! আমাদের বেস্ট ডান্সার এখনো ওঠেইনি, তাই তোমাদের হার নিশ্চিত!"
আরোবি হাসি চেপে বলে—
— "যদি আমাদের বেস্ট ডান্সার থাকে, তাহলে আমাদের বেস্ট-এর বেস্ট ডান্সারও আছে!"
ইয়াবি হাত তুলে প্রশ্ন তোলে—
— "যেটা ভালো, কিন্তু এই ডান্সে কে বলবে কে জিতল আর কে হারল? মানে, কে হবে জাজ?"
ইয়াবির প্রশ্নে মেয়েরা হেসে হাত উঁচু করে মঞ্চের বাঁ দিকের দিকে ইশারা করল—
সরাসরি মির্জা বেগমের দিকে!
— "Obviously none of them, আমাদের সকলের প্রিয় মির্জা বেগম! হা হা!"
ভিড় থেকে মৃদু হাসির ঢেউ উঠল। সবাই একটু চমকে গেলেও খুশি হয়েছে।
মির্জা বেগমের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল—যেন তিনিও গোপনে উপভোগ করছেন এই খেলাচ্ছলে খুনসুটি।
হিয়া— "তো, তোমাদের মধ্যে কে নাচবে?"
জারা— "হ্যাঁ, আগে থেকে বলে দিতে হবে না হলে..."
তিশা— "না হলে ডিসকোয়ালিফাই হয়ে যাবে!"
ইশান হেসে— "আরে আস্তে বলো!"
কাবির— "আমাদের মধ্যে থেকে কে নাচবে তাই তো?"
তূর্য গলা উঁচু করে— "কে আবার? আমার জানের দোস্ত, আমার কলিজা—কিরিস!"
হলভর্তি মানুষ থমকে গেল।
এই নামটা কেউ ভাবেনি।
কিরিস ভুরু কুঁচকাল, তূর্যের দিকে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই লিডি মজার সুরে ঢুকে পড়ল—
— "কি মনে করো তোমরা? আমি এই সবের মধ্যে নেই? নিজেদের মতো থাকো, স্টুপিড কোথাকার! এটা বলবে ভাইয়া?"
মুহূর্তে সবার চোখ চলে গেল লিসির দিকে।
কেউ হাসি চেপে রাখতে পারছে না, কিন্তু জানে—এটা যদি কিরিস দেখে ফেলে, তাহলে আজকের রাত কারো জন্য সহজ হবে না!
তাই যতটা সম্ভব মুখের কোণে হাসিটা লুকিয়ে ফেলল সবাই।
কিরিস এবার বড় বড় চোখে তাকাল লিসির দিকে—
"এটা কিছুটা বেশি হয়ে যাচ্ছে দিন দিন..."
কিরিস— "এর মানে কি আমি একবারও বলেছি?"
লিসি— "বলেননি তো, তাই আমি বলে দিলাম। আর তাছাড়া আমি মানলাম—আপনি গান ভালো গাইতে পারেন, সবই ভালো পারেন। কিন্তু নাচ? নাচতো নাও পারতে পারেন। এতে কোনো বিষয় না ভাইয়া, আমরা কিছু মনে করিনি!"
কিরিস ঠান্ডা কণ্ঠে— "তুমি বলতে চাইছো আমি নাচতে পারি না? আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো নাকি, লিসি শর্মা?"
লিসি গা এলিয়ে— "ধরতে পারেন তাই..."
হলভর্তি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে।
কেউ কখনো কল্পনা করেনি—কিরিসকে কেউ সরাসরি চ্যালেঞ্জ দেবে, তাও আবার এতোটুকু এক মেয়ে!
ছেলেরা মুখ চেপে হাসি থামাচ্ছে, মেয়েরা নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
তূর্য কোনমতে হেসে ফেলছে।
কিরিস এবার ধীরে ধীরে দু’পা এগিয়ে এল লিসির দিকে—
— "আচ্ছা, তাহলে আমি চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্ট করলাম। আর যদি আমি জিতি... তাহলে আমি কি পাবো, লিসি শর্মা?"
লিসি কিছু না ভেবে আস্তে করে—
— "যা চাইবেন, তাই দিতে পারি।"
কিরিসের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল—
— "ভেবে বলছো তো?"
লিসি হালকা ঘাবড়ে—
— "লিমিটের মধ্যে থাকলে দেব, বাইরে গেলে দিতে পারব না!"
কিরিস— "আরে না, বাইরে যাবো না... তাহলে আমি রাজি।"
এই কথা শুনে ছেলেরা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
তাদের আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট—তারা জানে, কিরিস মঞ্চে নামলে জয়ের সম্ভাবনা কতটা।
ইশান চিৎকার করে—
— "এবার তোরা বল, তোদের পক্ষ থেকে কে আসছে! আমাদের পক্ষ থেকে কিরিস, তোদের পক্ষ থেকে কে?"
আরোবি এক ঝটকায় উত্তর দিল—
— "যে চ্যালেঞ্জ করেছে, সে! আই মিন... লিসি!"
লিসি অবিশ্বাসে চোখ বড় করে তাকাল।
সে তো শুধু কিরিসকে রাজি করানোর জন্যই কয়েকটা কথা বলেছিল, আর এখন তো তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছে!
— "এটা কেমন কথা! আমি কেন?"
সুরভী হেসে— "আরে তুই না কেন বলবি!"
তিশা ঠোঁটে হাসি চেপে— "রাজি হয়ে যা..."
মঞ্চের এক পাশে বসে থাকা নুসরাত এবার গম্ভীর গলায় বলল—
— "এই লিসি, রাজি হয়ে যাও। এখন কিন্তু আমাদের মেয়েদের সম্মানের কথা তোমার হাতে।"
চারদিক থেকে মেয়েদের চোখ তার দিকে।
লিসি এক মুহূর্ত চুপ থেকে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল—
— "আচ্ছা, ঠিক আছে... আমিও দেখে নেবো।"
কিরিসের ঠোঁটে সেই পরিচিত চ্যালেঞ্জিং হাসি—
— "হারার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও, লিসি শর্মা।"
লিসি বাঁকা হাসি ফিরিয়ে দিল—
— "দেখা যাবে। আগে আপনি নাচেন তো!"
কিরিস আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে স্টেজে উঠল।
লাইট একটু কমিয়ে দেওয়া হলো, শুধু একপাশ থেকে হালকা গোল্ডেন স্পটলাইট এসে পড়ল তার ওপর।
সাদা পাঞ্জাবির কাপড় যেন সেই আলোয় হালকা সোনালি আভা ছড়াচ্ছে।
মঞ্চের চারপাশে ছেলেরা ঘিরে দাঁড়াল, ভাইরাও এগিয়ে এল।
দর্শকদের গুঞ্জন থেমে গিয়ে চারদিকে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ।
ডিজে হালকা ইশারা করল, সুর ভেসে উঠল—
♪ Tumne mohabbat karni hai
Humne mohabbat ki hai
Iss dil ke ilaawa kisi se bhi na
Humne ijaazat li hai... ♪
স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিসের মুখে একফোঁটা দম্ভও নেই—শুধু মনোযোগ।
গানের প্রথম লাইন শেষ হতে না হতেই তার পা নড়ল, কাঁধে হালকা মুভ, হাতের নিখুঁত ভঙ্গি।
তার নাচের ভঙ্গি দেখে সহজেই বোঝা যায়—এ মানুষ নাচে পটু।
গান, নাচ—তার কাছে কোনো কঠিন বিষয় নয়। জীবনে অসংখ্যবার নাচ প্র্যাকটিস করেছে,
তাই বিটে মুভমেন্ট মেলানো যেন তার জন্য শিশুখেলার মতো।
চারপাশের মেয়েরা হাঁ করে তাকিয়ে আছে—
মনে হচ্ছে যেন বাস্তব জীবনের শাহরুখ খান তাদের সামনে নাচছে।
প্রত্যেকটা স্টেপ যেন কোরিওগ্রাফারের বই থেকে সরাসরি তুলে আনা—
মসৃণ, সঠিক, আর তালে ভরা।
লিসি প্রথমে একটু অবাক হলেও, ধীরে ধীরে তার চোখে সেই অবাক ভাব বদলে গিয়ে মুগ্ধতা বসে গেল।
সে একদম মন দিয়ে দেখছে—কি সুন্দর করে নাচছে কিরিস!
গানের তালে তালে, প্রত্যেকটা স্টেপে স্টেপে, মিলের এত নিখুঁততা যে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরানো যাচ্ছে না।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াবি ফিসফিস করে বলল—
— "এবার তোরা হারবি, কিরিস ময়দানে নেমেছে..."
আরোবি মুচকি হেসে বলল—
— "ভুলে যাস না, লিসিও কিন্তু ময়দা দিয়ে আটা বানাতে পারে!"
আরোবির ইঙ্গিতটা পুরো বোঝা না গেলেও, সবাই টের পাচ্ছে—লিসিও কম কিছু না।
কিরিসের নাচের ভঙ্গি যেন গানের সাথে একাকার হয়ে গেছে।
মূল বিট উঠতেই স্টেজের আবহ বদলে গেল—লাইট আরও উজ্জ্বল, দর্শকের হাততালি আরও জোরালো।
♪ Jhoome jo Pathaan, meri jaan
Mehfil hi lut jaaye
De-de jo zubaan, meri jaan
Uss pe mar-mit jaaye... ♪
প্রতিটি লাইন যেন কিরিসের শরীর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে,
তার একেকটা মুভ স্টেজকে আরও সুন্দর আর প্রাণবন্ত করে তুলছে।
গানের শেষ বিটে কিরিস নিখুঁত স্পিন নিয়ে থামল,
হাত দুটো হাওয়ায় ছড়িয়ে মুচকি হাসি দিল—যেন বলছে, "এবার দেখি তোমার পালা, লিসি শর্মা।"
ভিড় থেকে ইয়াবি চিৎকার করে—
— "এবার গেম ওভার, মেয়ে মানে লিসি রেডি হও!"
তূর্য হাত উঁচু করে—
— "আরে ভাই, লিসিকে হেলাফেলা কইরো না, দেখবি কী হয়!"
সুরভী হাসতে হাসতে—
— "লিসি, এনার্জি ফুল অন! মেয়ে হয়ে হারিস না!"
তিশা ঠোঁট বাঁকিয়ে—
— "ওকে মনে করিয়ে দে, স্টেজে শুধু ছেলেদের রাজত্ব হয় না!"
লিসির ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অপূর্ব হাসি। এদিকে কিরিস ততক্ষণে মঞ্চ থেকে নেমে এসেছে। চারপাশে এক হালকা গুঞ্জন—এমন নিখুঁত, মুগ্ধকর নৃত্য কি কেউ টক্কর দিতে পারবে? আজকের এই মুহূর্তে তার উত্তর কারও জানা নেই। সবাই অধীর অপেক্ষায় মেয়েদের পক্ষের পরিবেশনার জন্য চোখ রাখল মঞ্চের দিকে।
লিসি সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে সুরভীর কানে কানে কিছু বলে দিল সে। সুরভী যেন বাধ্য কন্যা, দৌড়ে চলে গেল গার্ডেনের এক কোণে, যেখানে আলো-সজ্জার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ রাখা। সেখানে বসা এক ব্যক্তির কানে কিছু ফিসফিস করল—প্রথমে খানিক অবাক হলেও, তিনি শেষমেশ মাথা নাড়লেন।
লিসি মঞ্চে পা রাখতেই পাশে থাকা যত আলো ছিল, এমনকি মঞ্চের স্পটলাইটও নিভে গেল। মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে গেল গার্ডেন। একটিও লাইটের বিন্দু দেখা যাচ্ছে না। চারদিকে চাপা গুঞ্জন—কী হতে চলেছে? কেবল মঞ্চের উপর ভাসছে এক অদ্ভুত, মৃদু, মৃত-প্রায় আলো, যেন পূর্ণিমার চাঁদের স্রোত এসে তার গায়ে পড়েছে। চাঁদের রূপালি আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চারপাশ—তবু যেন সময় থমকে গেছে।
তারপর—
মৃদু সুরে ভেসে এল গানের তাল।
লিসি নিখুঁত ভঙ্গিমায় হাত-পা নাড়াল। না, এ নৃত্য কোন শাস্ত্রীয় ধারা নয়, আবার পাশ্চাত্যও নয়—এ এক রহস্যময়, অব্যাখ্যাত নৃত্য। যেন প্রতিটি পদক্ষেপে কোনো অদৃশ্য মন্ত্র বোনা হচ্ছে বাতাসে। দর্শকেরা বাকরুদ্ধ। কেউ চোখের পলক ফেলছে না।
“—Nazar jo teri laagi main deewani ho gayi,
Deewani haan deewani, deewani ho gayi…”
মঞ্চের প্রতিটি স্টেপে, প্রতিটি ঘূর্ণনে, প্রতিটি হাতের ভঙ্গিতে যেন জাদুর নেশা।
এই দৃশ্য দেখে কিরিসের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল—যেন তার সামনে এমন কিছু ঘটছে, যার জন্য সে অগণিত জন্ম ধরে অপেক্ষা করেছে। বুকের ভিতর হঠাৎ করে জমে উঠল এক ভারী, অস্থির যন্ত্রণা। নিজের ডান হাতটি বাম পাশের বুকে রাখল—হৃদপিণ্ড এত জোরে ধকধক করছে, যেন আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই তা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে।
কেন এমন হচ্ছে? সে জানে না।
এ এক অদ্ভুত, অসহ্য, অথচ মায়াবী অনুভূতি—যা তার মগজ কুরে কুরে খাচ্ছে, রক্তে আগুন জ্বালাচ্ছে, তাকে পাগল করে দিচ্ছে।
লিসির প্রত্যেকটা নাচের স্টেপ তার চোখে যেন এক অমর চিত্রের মতো ফুটে উঠছে। মনে হচ্ছে—সে হাজার বছর ধরে এই মেয়েটিকে চেনে, তাকে দেখে এসেছে, তাকে নিজের করে রেখেছে।
সে তার—শুধুই তার।
এ অধিকার অন্য কারও নেই, কখনও থাকবে না।
কিরিস—যে কখনো ঘামে না—আজ কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক-দুই ফোঁটা ঘাম। মাথার এলোমেলো চুলের ফাঁক বেয়ে নেমে আসা সেই ফোঁটা তার অপরাজেয় ভাবমূর্তিকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। হাত দিয়ে চুল ছুঁয়ে সে খেয়াল করল—চুলগুলো লেপ্টে গেছে মাথায়। শরীর জুড়ে এক অজানা তাপ। তার দৃষ্টি লিসির গায়ে এমনভাবে আটকে আছে, যেন পৃথিবীতে অন্য কিছু দেখার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে।
শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে—খুবই ভারী। মনে হচ্ছে, এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের ভিতরের এই ঘূর্ণিঝড় সে সামলাতে পারছে না।
ঠিক তখনই কিরিস চোখ ঘুরিয়ে তাকাল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আর্থের দিকে। কেবল চোখের ভাষায় জানিয়ে দিল—সে কী চায়, সে কেমন কষ্টে আছে। সেই দৃষ্টিতে এমন এক ভার ছিল, যা কথায় বলা যায় না—যেন মৃত্যুর আগের শেষ অনুরোধ।
সব বুঝে গেল মার্ক। এত বছরের সঙ্গ—এখন আর মুখের প্রয়োজন নেই, চোখই যথেষ্ট। কিরিস একপাশে সরে গেলে, মার্ক এসে তার হাতে দিল কালো কাচের ছোট্ট এক শিশি। ভিতরে কী আছে, বোঝা যায় না—তবে তরল পদার্থ। কিরিস শিশির মুখ খুলে এক নিঃশ্বাসে পান করল।
বুকের ভেতরের তীব্র যন্ত্রণা সামান্য শান্ত হল, কিন্তু সে জানে—এ কষ্ট কোনো শারীরিক কারণে নয়। এই যন্ত্রণার আসল দোষী মঞ্চে নাচতে থাকা এক অপূর্ব কেশবতী নারী, যার শরীর জুড়ে চাঁদের আলো খেলে যাচ্ছে, যার প্রতিটি পদক্ষেপ সুরের মন্ত্রে বাঁধা, যার অঙ্গভঙ্গি ও রূপ সৌন্দর্য তাকে উন্মাদ করে তুলছে।
নিজেকে সামলাতে, কিরিস চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিল। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল—যেন নিজের ভিতরের আগুনকে ছাইয়ের নিচে লুকিয়ে রাখছে।
এদিকে, লিসি গানের শেষ লাইনে প্রাণ উজাড় করে নাচ শেষ করল। হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের দুই হাত প্রসারিত করল, শাড়ি দিয়ে বানানো লেহেঙ্গার প্রান্ত সামান্য তুলল, মাথা নিচু করল। চারদিক নিস্তব্ধ—এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হল, হয়তো নাচটি কারও ভালো লাগেনি।
মাথা তুলতেই—
এক তালি।
দুই তালি।
তারপর হঠাৎ—হাজারো করতালি ও উল্লাসের ঢেউ!
পুরো গার্ডেন মুগ্ধতায় কেঁপে উঠল। মেয়েরা হই-হুল্লোড়ে চেঁচিয়ে উঠল—অবশেষে তারা জিতবে। কিন্তু সবার চোখ গিয়ে ঠেকল বিচারকের দিকে—মির্জা বেগমের দিকে। তার দৃষ্টিতে এক গভীরতা, এক গোপন ভাষা, যা শুধু তিনিই জানেন।
ছেলেরা আর মেয়েরা সমান উল্লাসে চিৎকার করছে—
"ওয়াওওওও!"
মির্জা বেগম মাইক্রোফোন হাতে নিলেন, ঠোঁটে হাসি—
— "এবার তো আমি নিজেও কনফিউজড, কার নাম বলব... দুইজনই একদম জমিয়ে দিয়েছে!"
পাশ থেকে সুরভী চেঁচিয়ে—
— "অবশ্যই লিসি!"
ইয়াবি হাসি চাপতে চাপতে—
— "আরে না না, কিরিস!"
তূর্য হাত উঁচু করে—
— "ড্র করো! ড্র!"
মির্জা বেগম হাত তুলে ভিড়কে শান্ত করলেন—
— "যেহেতু ছেলেমেয়ে দুই পক্ষই নিজেদের সেরাটা দিয়েছে, আমার মতে এটা টাই... আর পুরস্কার দুইজনই পাবে!"
ভিড় থেকে একসাথে চিৎকার—
"ওয়াও! ইয়েসসস!"
পুরস্কার দিতে মঞ্চে যখন দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করানো হলো,
কিরিস হালকা ঝুঁকে লিসির কানে বলল—
— "তুমি ভালো নাচো... স্বীকার করলাম।"
লিসি মুচকি হেসে—
— "আপনিও... তবে হারানোর জন্য প্রস্তুত হোন, পরের রাউন্ডে।"
কিরিসের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটল—
— "আমি অপেক্ষায় থাকব, লিসি শর্মা।"
তাদের এই নীরব কথোপকথন কেবল কাছাকাছি থাকা কয়েকজনই টের পেল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তূর্য আর ইয়াবি একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল—
"এই দুইজনের মধ্যে কিছু আছে, বাজি ধরতে পারি!"
সবার মধ্যে হালকা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে
গার্ডেনের চারপাশে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে। হালকা গুঞ্জন, মাঝেমধ্যে ছোটখাটো তর্ক— কারো চোখে কৌতূহল, কারো ঠোঁটে ব্যঙ্গ।
সবচেয়ে বড় ছেলে, পাশে এক ছোট্ট মেয়ে, আর হাতে গোনা কয়েকজনই জানে— লিসি এই বাড়িরই মেয়ে। বাকিরা অজানা— কে এই মেয়েটি?
— "আরে খেয়াল করেছিস? মেয়েটার হাতের চুড়ি দুটো দেখেছিস? সুপ্রিয়ার হাতে যেমনটা দেখেছিলাম, হুবহু তেমন। কিছু একটা মিল আছে রে… আর দেখছিস কিরিসের এত কাছে বসে আছে! যে কিনা কোনো মেয়েকে কাছে সহ্যই করে না!"
— "তুই বোঝ না? বড়লোকি ঘরের মেয়ে… টাকা-পয়সার কষ্ট নেই। যা ইচ্ছা তাই করবে— নিয়ম মানতে হবে কেন!"
সমাজে এমন মানুষ আছে— যারা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, আরেক দল আছে— যারা অন্যদের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকে। এই ধরনের কানাঘুষা মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যা মুখে না বললেই ভালো।
এদিকে নাচ শেষ, স্টেজের আলো ম্লান। সবাই একটু হাঁপাচ্ছে— কপালে ঘাম, বুক ধুকপুক। প্রতিটি স্টেপ নিখুঁত করতে কতটা কষ্ট হয়েছে তা শুধু নৃত্যশিল্পীরাই জানে। লিসি অভ্যস্ত— ক্লান্তির মাঝেও হাতে ধরা ঠান্ডা শরবতে ছোট্ট চুমুক দিচ্ছে। চারপাশে হালকা শীতল বাতাস, সামান্য বিরতি— কারণ কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার তাল-লয়ে ঝড় তুলতে হবে।
স্টেজের ওপরে বসে থাকা নুসরাত গ্লাসটা নামিয়ে রিহানের দিকে তাকিয়ে যেন একরাশ অভিমান গলায়—
নুসরাত — "দেখো, তোমার কত ভাই আছে… আজ তোমাকে কত সুন্দর সুন্দর উপহার দিচ্ছে।"
রিহান কিছু বলার আগেই, পেছন থেকে ভেসে আসে কিরিসের গভীর, ঠান্ডা অথচ ধারালো কণ্ঠস্বর—
কিরিস — "কেন? আমরা কি তোর ভাই নই?"
নুসরাত হকচকিয়ে ঘুরে তাকায়— কিরিসের চোখে শীতল দৃষ্টি, ঠোঁটে এক বিন্দু হাসি নেই।
নুসরাত — "না না, আমি সেটা বলতে চাইনি…"
কিরিস ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে— প্রতিটি পদক্ষেপে যেন একরাশ অধিকার চাপা পড়ে আছে।
কিরিস — "তাহলে কি বলতে চাইছিস? শোন— আমরা সবাই তোর ভাই। তোর শুধু একজন নয়, গোটা পাঁচটা ভাই আছে।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই কিরিসের হাত ইশারায় পাশের দিকে—
কিরিস — "আর তাছাড়া পাশে যে বসে আছে… সেও তোর ভাই হয়।"
রিহান এবার থতমতো খেয়ে হেসে ফেলে—
রিহান — "আরে কী বলছিস! বিয়ে হয়ে গেছে— ভাই বানাচ্ছিস কেন? স্বামী হই, ভাই না।"

0 Comments