ঘর অন্ধকার। হালকা চাঁদের আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে বিছানায় পড়ছে।

আরোবি উঠে বসে—
— “শোন, তুই আমাকে আপু বলবি না। শুধু আরোবি বলবি।”
লিসি একটু থেমে— “কিন্তু তুমি তো আমার বড়।”
আরোবি— “বড়? হা হা হা! কিসের বড়? তুই শুধু আরোবি বলবি, বুঝেছিস?”
লিসি— “কিন্তু...”
আরোবি— “না কোনো কিন্তু নয়। আর শোন, কালকে মার্কেট যাবো, তাই সকাল সকাল উঠতে হবে।”
লিসি হালকা মুচকি হেসে— “ঠিক আছে।”
আরোবি— “চল তাহলে, এখন ঘুমিয়ে পড়ি।”

🌙 রাতের অন্য প্রান্তে...
রায় চৌধুরী বাড়ির অপর পাশে, আধা-অন্ধকারে আলোকিত এক ঘরে বসে জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী ফোনে কথা বলছে মার্কের সাথে।
মার্ক— “বস, সে এখনো কিছু বলছে না।”
কিরিস এক হাত দিয়ে D'Amalfi Limoncello Supreme এর বোতল থেকে ধীরে ধীরে ওয়াইন গ্লাসে ঢালছে। মুখে ঠাণ্ডা এক গম্ভীরতা।
কিরিস— “তাহলে ওকে জ্যান্ত কেটে ফেল। আর হ্যাঁ, নিশ্চিত হও ওর চিৎকার যেন আমি শুনতে পাই।”
মার্ক— “Yes, Boss.”
একটু পর ফোনের ওপাশে এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদ ভেসে আসে। কিরিস ঠাণ্ডা এক শয়তানি হাসি হেসে বলে—
কিরিস— “মার্ক, আমি রাখছি। পরের কাজটা তুমি শেষ করো।”
মার্ক— “Okay, Boss.”
কিরিস ফোন রেখে ধীরে পায়চারি করে বারান্দায় আসে। চুপচাপ চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
🌙 রাত ১:২৩
লিসির ঘুম হঠাৎ ভেঙে যায়। মুখে পিপাসা।
ওঠে পানি খেতে গিয়ে দেখে জগে পানি নেই। নিচে নামতে গিয়েই চোখ আটকে যায়।
সামনে পিলারের মতো এক পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে — নিঃস্তব্ধ, নীরব।
লিসি একটু ভয় পেয়ে ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বলে—
“ভাইয়া...? এত রাতে এখানে কী করছেন? ভাইয়া?”
কোনো সাড়া নেই।
লিসি সাহস করে হাত রাখতেই কিরিস হঠাৎ তার ওপর পড়ে যায়।
লিসি আতকে উঠে— “ভাইয়া! আপনি...?”
তুলতে গিয়ে টের পায় কিরিসের শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।
“এই লোকটারও জ্বর হয়! আরে পাগল লিসি, ইনিও তো মানুষ...”
লিসি দেরি না করে কিরিসকে কষ্ট করে টেনে নিয়ে আসে ঘরে।
শুইয়ে দিয়ে নিজের কোমর চেপে ধরে বলে—
“বাবা রে! মানুষ না আটার বস্তা! কোমরের হাড্ডিগুড্ডি গেল মনে হয়!”
চলে যেতে চায়, কিন্তু কিরিস ওড়না টেনে ধরে।
লিসি— “আরে ছাড়ুন!”
কিরিস ঘোরে— “...পানি...”
লিসি ঠোঁট বাঁকিয়ে— “বেশ চালাক আপনি! ঠিক আছে, আনছি।”
নিচ থেকে পানি আর জলপট্টি নিয়ে এসে কিরিসকে পানি খাওয়ায়, তারপর মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে।
কিরিসের জ্বর কিছুতেই কমে না।
লিসি মুখে ফিসফিস করে—
"আগে থেকে বলে নেওয়া ভালো না হলে পরে আমার নামে কিনা জানি বলবে,,,,এই যে শুনছেন আমি আপনার গা টা মুছিয়ে দিচ্ছি ভাইয়া,"
ও কিরিসের শার্টের তিনটা বোতাম খুলে গা মুছে দেয়। সেবার লিসি নিজেও টের পায় না কখন ঘুমিয়ে গেছে।
ভোর ৫:৪৭ মিনিট।
ঘুম ভাঙে লিসির। চোখ খুলতেই দেখে, জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী—চোখে আগুন, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি—চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে আছে।
লিসি কিছু বলার আগেই—
কিরিস (ঠান্ডা গলায়):
“তুমি আমার ঘরে কি করছো? দাঁড়াও... তুমি কি আমার সম্মানহানি করতে এসেছিলে?”
লিসি (চোখ বড় বড় করে):
“কি!!... পাগল নাকি আপনি?!”
কিরিস (ভুরু কুঁচকে):
“সত্যি করে বলো তুমি কি করতে আইছিলে! আমি কিন্তু বাড়ির সবাইকে বলে দিবো... তুমি আমার সম্মানহানি করতে এসেছিলে।”
লিসি (রেগে গিয়ে):
“পাগল নাকি আপনি?! এই ডায়লগ তো আমার বলা উচিত আপনার না!”
কিরিস (গম্ভীর হয়ে):
“দেখছো? মানে তুমি সত্যি সত্যিই কিছু করতে এসেছিলে... আমি এখনই মাকে বলে দিচ্ছি।”
লিসি:
“কি বলবেন?”
কিরিস:
“যে তুমি আমার সাথে ‘উম উম’ করতে আইছিলে।”
লিসি (অবাক ও রেগে):
“কি বলছেন আপনি?! আমি কখন আপনার সাথে উম উম করতে আইছি?!”
হঠাৎ কিরিস বাচ্চাদের মতো মুখ কুঁচকে কান্না করার ভান করে—
কিরিস:
“আমি মা'কে বলে দেবো... না, সবাইকে বলেই দিবো... যে তুমি আমার ঘরে...”
লিসি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে—
লিসি:
“আরে আমি কিছু করিনি! উল্টো আপনি তো সারা রাত আমার ওড়না ধরে রেখেছিলেন, তার বেলা?”
কিরিস:
“আমি মাকে ডাকবো... মা—!”
বলতেই লিসি ছুটে গিয়ে কিরিসের মুখ চেপে ধরে—
লিসি:
“চুপ করুন! আমার বাবা, কাউকে কিছু বলবেন না!”
কিরিস (ভ্রু উঁচু করে):
“আমি কখন আবার তোমার বাবা হলাম? আর আমি চুপ থাকলে কী পাবো?”
লিসি (রাগ চেপে):
“যা চাইবেন তাই দিবো।”
কিরিস (একটু হেসে):
“সত্যি?”
লিসি:
“হুম।”
কিরিস এবার কান্না থামিয়ে গভীর ও সিরিয়াস গলায় বলে—
কিরিস:
— “তাহলে আজ থেকে আমি যা বলবো, তুমি তাই করবে।”
লিসি (চোখ রাঙিয়ে):
“মগের মুল্লুক নাকি! আপনি যা বলবেন আমি তাই করব?!”
কিরিস (চোখে শয়তানি হাসি):
“তাহলে আমি সবাইকে বলে দেবো...”
লিসি এবার রেগে গর্জে ওঠে—
লিসি: “যান বলেন! আপনার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না, সবাই জানে আমি ভালো মেয়ে!”
কিরিস:
“সত্যি বলবো!”
লিসি:
“দেন!”
কিরিস:
“একবারও কি ভেবে দেখেছো, এত সকালে—না না, ভুল বললাম—সারা রাত তুমি আমার সাথে এক ঘরে ছিলে! আমি যদি বলি, তোমার আর আমার মাঝে কিছু হয়েছিল, কয়জন মানুষ বিশ্বাস করবে যে কিছু হয়নি?”
লিসি:
— “কিন্তু সত্যি তো কিছু হয়নি!”
কিরিস (ঠান্ডা গলায়):
— “সেটা তুমি আর আমি জানি। বাইরের লোক জানে না। ঠিক আছে, তাহলে বলে দিচ্ছি।”
কিরিস দরজার দিকে হাঁটা দেয়।
লিসির মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
লিসি (নিজেকে শক্ত করে):
— “দাঁড়ান... আমি রাজি, আপনার শর্তে!”
এই কথা বলতেই কিরিস সিংহের মতো ফিরে আসে, বেডের পাশে রাখা ফোনটা তুলে নেয়, রেকর্ডিং অন করে বলে—
কিরিস:
— “আবার বলো।”
লিসি হতভম্ব। চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
কিরিস:
— “কি হলো লিসি র্সামা, বলো!”
লিসি (ঘাড় নিচু করে):
— “আমি মুখে বলেছি, তাও বিশ্বাস হচ্ছে না?”
কিরিস (মুচকি হেসে):
— “না, হচ্ছে না। আমি বিজনেসম্যান, মুখের কথায় নয়... প্রমাণে বিশ্বাস করি।”
লিসি (চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে):
— “কোথায় ফেঁসে গেলি তুই…”
কিরিস:
— “কি বলছো?”
লিসি (দাঁতে দাঁত চেপে):
— “কি বলবো ভাইয়া…”
কিরিস:
— “বলো— 'আমি, লিসি র্সামা, আজ থেকে জিয়ান কিরিস রায় চৌধুরী যা বলবে, আমি তাই করবো।’”
লিসি চুপচাপ বলেই দেয়।
কিরিস একটানে রেকর্ডিং সেভ করে।
কিরিস:
— “চলো, এখন বের হও।”
লিসি কিছু না বলে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিরিস হাত ধরে তাকে দরজার সামনে নিয়ে যায়।
লিসি (রেগে):
— “মানে আপনি সব ইচ্ছা করে করছিলেন?!”
কিরিস:
— “যেটাই হোক... আজ থেকে তুমি এই কিরিসের... গোলাম।”
একটা মুচকি অথচ বিজয়ী হাসি দিয়ে কিরিস দরজা বন্ধ করে দেয়।
লিসি হতভম্ব। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে দরজার সামনে বসে পড়ে।
নিজের হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে বলে—
লিসি:
— “তোর কোনোদিন বউ জুটবে না রাক্ষস কোথাকার! মানুষকে সাহায্য করতে নেই... একদম করতে নেই!”
এই সময় আরোবি এসে—
আরোবি— “এই, তুই এখানে কী করছিস? আমি তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি!”
লিসি— “কিছু না।”
আরোবি— “তুই কিরিসকে গাল দিচ্ছিস?”
লিসি— “হ্যাঁ, এখন বকবি?”
আরোবি— “কে বলেছে বকবো? আমিও দিচ্ছি। আরও দে!”
দুজন মিলে যা-তা বলছে কিরিসকে, যদিও কিরিসের কানে কিছুই পৌঁছায় না।
আরোবি হঠাৎ থেমে—
— “আসলে আমরা ওনাকে গাল দিচ্ছি কেন?”
লিসি— “ওনাকে বকার জন্য কি আলাদা কারণ লাগে?”
আরোবি— “একদম ঠিক বলেছিস!"তুই না বাড়ি ঘুরে দেখতে চাস? তাই উঠলাম।”
লিসি— “হ্যাঁ, আগে ফ্রেশ হয়ে আসি।”
আরোবি— “ততক্ষণে আমি সুরভী আর তিশাকে ডেকে তুলছি।”
লিসি ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখে, আরোবি ইতোমধ্যেই সুরভী ও তিশাকে ডেনে ঘুম থেকে তুলে এনেছে। চোখে ঘুমের ছাপ থাকলেও ওদের মুখে হাসি।
সুরভী:
"শুধু তোর জন্য লিসি, না হলে এখন কে ঘুম থেকে উঠত বল?"
আরোবি (হেসে):
"চল তোকে বাড়ির ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখাই।"
আরোবি লিসিকে নিয়ে পুরো বাড়ির প্রতিটি ঘর একে একে দেখাতে শুরু করলো। রাজপ্রাসাদের মতো বিশাল বাড়ি, প্রতিটি ঘরই যেন একটা করে গল্প।
লিসি (চোখ বড় বড় করে):
"এতগুলো ঘর! কয়টা হবে মোট?"
সুরভী (মাথা নেড়ে):
"১৬ টা ঘর, একদম ঠিক।"
লিসি (অবাক হয়ে):
"এতগুলো ঘরে কে থাকবে?"
তিশা (হেসে):
"আরে পাগল! কালকে দেখবি কারা আসে। সবাই একে একে আসবে, তখন সব ঘর পূর্ণ হবে।"
আরোবি:
"হয়েছে ঘর দেখা শোনা। আমরা ভাইবোনেরা উপরতলায় থাকি। আর নিচে থাকে বড় আব্বু, আব্বু। দাদি যখন আসেন, তখন উনিও নিচেই থাকেন।"
লিসি একটু থেমে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে, চোখ নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
লিসি (শান্ত গলায়):
"হুম... কিন্তু একটা সত্যি কথা বলি?"
তিশা (উৎসুক হয়ে):
"কি?"
লিসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে— “সব গুলিয়ে ফেলেছি।”
তিশা— “প্রথম প্রথম আমি-ও ফেলতাম।”
ওরা নিচে নামলে সুপ্রিয়া আপু (বড় আম্মু) জিজ্ঞেস করেন—
— “কি ব্যাপার রে প্রিয়া, আজ এরা এত সকালে?”
আরোবি— “মনে হচ্ছে আমরা কোনোদিন উঠি না!”
সুপ্রিয়া হেসে— “তাই তো!”
— “চা খাবি? বানিয়ে দেই?”
সুরভী— “না বড় আম্মু, আগে বাড়ি ঘুরে দেখি, তারপর খাবো।”
মির্জা বেগম কাঁধে হালকা শালে হাত বুলিয়ে বললেন,
"ও তাহলে আগে ওকে দেখিয়ে আয়, তারপর বসে চা খাবো, ঠিক আছে?"
আরোবি চোখ মেলে দাদিকে দেখে হেসে বলে —
"এই জন্যই তো তোমাকে আমার এত পছন্দ দাদিজান!"
আরোবি মুখ ঘুরিয়ে লিসির দিকে তাকায়,
"লিসি চল, তোকে এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটা দেখাই।"
লিসির কৌতূহলী চোখ আরোবির চোখের উচ্ছ্বাসে মিলিয়ে যায়।
দু’জনে ধীরে ধীরে রায় চৌধুরী বাড়ির পেছন পাশে চলে যায়।
পেছনের অংশটা যেন অন্য এক জগৎ।
শান্ত, নিরিবিলি প্রাকৃতিক পরিবেশে সাজানো বিশাল বাগান।
চারপাশে ঘন সবুজ গাছের ছায়া, নরম ঘাসে ঢাকা জমিন, হালকা বাতাসে ফুলের গন্ধে ভরপুর একটা আভিজাত্য।
কয়েকটি আয়েশি চেয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।
চেয়ারে বসে আনোয়ার আর আনারুল হালকা আলোয় গল্প করছেন।
ওদের দেখে আনারুল হাসতে হাসতে বলে —
"তুরা এখানে আয় বয়!"
পেছন থেকে সুরভী বলে —
"না বাবা, পরে আসছি, আগে ওদিকটা দেখে আসি!"
আনোয়ার গম্ভীর গলায় বলে —
"যা, গিয়ে সকালের আবহাওয়া গায়ে লাগিয়ে আয়।"
আরোবি লিসির হাত টেনে একটু সামনে এগিয়ে যায়।
সেখানে চোখে পড়ে একটা আলাদা জগত —
রঙিন ফুলে ভরা একটা বিশাল বাগান।
গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, ঝুমুরফুলের ভিড়ে এক কোণায় ছোট্ট টিউলিপের বাগান,
যা যেন নিঃশব্দে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।
সব রঙিন ফুল ফেলে লিসির চোখ আটকে যায় ওই টিউলিপের গাছগুলোর দিকে।
সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকে সুরভীর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করে—
"এই ফুল কে লাগিয়েছে?"
আরোবি সাথে সাথে বলে ওঠে —
"ওটা দেখার জিনিস, ছোঁয়া যাবে না!"
লিসি একটু অবাক হয়ে বলে —
"কেনো?"
সুরভী হালকা হাসতে হাসতে বলে —
"কারণ ওটা কিরিস লাগিয়েছে। এই ফুল গাছ লাগাতে ও যে কত টাকা খরচ করেছে, তা কে জানে!"
লিসি মনে মনে বলে —
(“বাবা বেটা মানুষরাও আবার ফুল পত্তি এত ভালোবাসে নাকি!”)
তার চোখে যেন কিরিসের ভয়ংকর রূপ একপাশে, আর এতোটা সংবেদনশীল দিক অন্যপাশে।
ভাবনায় ডুবে যাওয়া লিসিকে আরোবি টেনে নিয়ে যায় সামনের দিকে।
সেখানে দেখা যায়—
তাজা সবুজ শাকসবজির সারি।
লাউ, টমেটো, ধনেপাতা এমনকি কমলা গাজরও রয়েছে।
আরোবি গর্ব নিয়ে বলে —
"বড় আব্বু সবজি লাগাতে পছন্দ করেন, তাই এগুলো সব উনার হাতে লাগানো।"
লিসি আর একটু সামনে গিয়ে চোখ বড় করে বলে ওঠে—
"এটা বাড়ির গার্ডেন না কলেজের ক্যাম্পাস? এতো বড়ো!"
সুরভী মাথা নাড়িয়ে বলে —
"বাড়ির যত বড় বড় অনুষ্ঠান এখানে হয়, যেমন রিহানের বিয়ের অনুষ্ঠানও এখানেই হবে।"
লিসির চোখে বিস্ময়।
এই বাড়ির প্রতিটা কোণেই রাজকীয়তা।
একটা ঘাসে ঢাকা বিশাল মাঠ — যেন সিনেমার লোকেশন।
তারপর তারা ধীরে ধীরে বাড়ির একদম পাশ ঘেঁষে আসে।
সেখানে সুবিশাল সুইমিং পুল।
নির্মল নীল জল, পাশেই সাদা মার্বেলের বসার জায়গা।
লিসি মজা করে বলে —
"এখানে আবার কে গোসল করে?"
আরোবি হেসে ফেলে —
"এই বাড়ির ঝাকানাকা পোলারা!"
সুরভী বলে —
"বেশিরভাগ সময় কিরিস করে, যখন বাড়িতে থাকে। আর না হলে কাবির, রিহান... মাঝে মাঝে আমরাও করি!"
সুইমিং পুলের পাশেই কাঁচে ঘেরা একটা অত্যাধুনিক জিম।
অভ্যন্তরে ট্রেডমিল, ওয়েট, বারবেল থেকে শুরু করে নানা রকম আধুনিক জিম ইকুইপমেন্ট।
আরোবি বলল —
"ওটা হচ্ছে কিরিসের জায়গা। ওখানে উনি ওনার বডি বানান!"
লিসি একটু থেমে বলে —
"আর কিছু আছে দেখার মতো?"
সুরভী চোখে মিষ্টি হাসি নিয়ে বলে —
"অবশ্যই! এখনো লাইব্রেরি, অফিস, ছাদ বাগান—সব বাকি!"
তিশা পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলে —
"চল লিসি, এইটা শেষ!"
বাড়ির পিছনের দিকে মার্বেল পাথরে মোড়ানো এক চওড়া সিঁড়ি দোতালার দিকে উঠে গেছে। ধীরে ধীরে ওরা সবাই সেই সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে—প্রতিটি ধাপ যেন একেকটা গল্পের সিঁড়ি। ওপরে উঠে যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা যেন স্বপ্নের মতো।
ছাদের ওপর এক অপরূপ ছাদবাগান! গোলাপ, গাঁদা, টগর আর বেলির ঘ্রাণ মিশে এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করেছে। ছোট ছোট ঝর্ণার মতো সাজানো গাছের টব, পাশে কাঠের শেডে বসার জায়গা। পাখির কিচিরমিচির শব্দ যেন ছন্দে ছন্দে বলছে—"এই বাড়ির প্রতিটা কোনা রাজার রাজত্ব!"
ছাদবাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে আরোবি একটি কাঠের দরজা খুলে বলে—
"এই দেখ, আমাদের লাইব্রেরি।"
ভিতরে ঢুকতেই লিসির চোখ ছানাবড়া। দেয়ালজুড়ে কাঠের আলমারিতে গাদাগাদা বই—শুধু বই নয়, ইতিহাস, সাহিত্য, থ্রিলার, ক্লাসিক, উপন্যাস—সব মিলিয়ে যেন এক জ্ঞানসমুদ্র।
আরোবি হেসে বলে—
"বইগুলো সাধারণত বাবা পড়ে, বাবা বই পড়তে পছন্দ করে বলেই কিরিস ভাইয়া বাবার জন্য পুরো একটা রুম ভরে দিয়েছে বইয়ে।"
লাইব্রেরির পাশে একটি ছোট্ট কিন্তু মাধুর্যে ভরপুর অফিস রুম। আধুনিক আর প্রাচীনতার মিশ্র এক সজ্জা। দরজার পাশে বাঁ পাশে রয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন ওয়াইন কর্নার—সুদৃশ্য বোতলে বাহারি রকমের ওয়াইন। পাশে কয়েকটি কাঠের চেয়ারে বসার ব্যবস্থা, যেন অতিথিদের আপ্যায়নে এক রাজকীয় আসর বসে এখানে।
এই দৃশ্য দেখে লিসি ক্লান্ত গলায় বলে—
"থাক আর দেখাতে হবে না... আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি দেখতে দেখতে!"
ওর কথায় সবাই একসাথে হেসে ওঠে—সে হাসি যেন একটানা বয়ে চলা পারিবারিক খুশির নদী।
সুরভী মজা করে বলে—
"আর নেই কিছু, চল নিচে!"
লিসি কৌতূহলভরে বলে—
"আচ্ছা, এই মদ খেলে মামারা বকে না?"
আরোবি হেসে বলে—
"আরে আব্বুরো মাঝে মাঝে খায়। বলতে গেলে সবাই খায় মাঝে মাঝে। বেশি খায় কিরিস ভাইয়া। আর যখন কোনো ডিল ফাইনাল হয়, তখন তো বটেই, বড় প্রজেক্টের সেলিব্রেশনে এই কর্নারটা ব্যবহার হয়। তবে আমরা কিন্তু খাই না!"
লিসি মাথা নাড়ে—
"বুঝলাম... আর বইগুলো?"
আরোবি জবাব দেয়—
"বাবা পড়ে। ওখানে তুই হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে কাজী নজরুল পর্যন্ত সবার বই পাবি। আর হ্যাঁ, উপন্যাসের অনেক বই আছে যেগুলো সুরভী পড়ে। ও তো উপন্যাস বলতে পাগল!"
সুরভী গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে—
"তাতো! তুই কি বুঝবি উপন্যাস পড়ার মজা?"
তিশা বলে ওঠে—
"আচ্ছা হয়েছে, এবার তোরা মারামারি করিস না। নিচে চল!"
ওরা সবাই একসাথে নিচে চলে আসে। লিভিং রুমে তখন সকালের হালকা আলো ছড়িয়ে পড়েছে। টেবিলে রাখা চা, বিস্কুট, আর সবাই জমে উঠেছে আড্ডায়। ওদের আসতে দেখে প্রিয়া স্নেহভরে বলে—
"চলে এসেছিস, আয় চা নে।"
আরোবি একটু ঢং করে বলে—
"নাইহি খাবো তোমার চা! Why? তুমি দাওনি আগে আমাদের!"
রিহান তখন ঠাট্টা করে বলে—
"খেতে হবে না, এক কাপ চা বেঁচে যাবে।"
কাবির হেসে বলে—
"মারহাবা রিহান!"
ওরা সবাই ছোপাতে এসে বসে। তখন লিজা বলে—
"ওকি, গান না গজল গেয়েছে যে তুই ‘মারহাবা’ বলছিস?"
লিজার কথায় ইশান বলে—
"তুম নাহি সামঝোগে লিজা, আমাদের চিন্তা!"
জারা হেসে বলে—
"ভাগ্যিস বুঝি না! না হলে এতদিনে গাদা হয়ে যেতাম!"
হাসি-ঠাট্টা চলতে থাকলেও মুহূর্তেই আবহটা বদলে যায়, যখন কমলা এসে সুপ্রিয়ার সামনে একটি বোতল রেখে বলে—
"আমি কই ছিলাম, আমায় পাঠায়ও না। সাহেব বলেছেন লিসিকে নিয়ে যেতে এই বোতল।"
কমলার কথা শুনে এক নিমেষে লিসির হাসি-ভরা মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
প্রিয়া থমকে গিয়ে বলে—
"কি বলছিস তুই?"
কমলা সরলভাবে বলে—
"সাহেব আমায় বললো গিয়ে এই কথা বলতে... পরে যেটুকু যার বুঝার, সে বুঝে নিবে!"
লিসি এবার আর বসে থাকতে পারে না। ছোপা থেকে উঠে যায় সুপ্রিয়ার কাছে, চোখে নিঃশব্দ ভয় আর অধীরতা নিয়ে বলে—
"মামি, আমি যাচ্ছি... ভাইয়া কোথায়?"
ওর এমন আচরণ দেখে আরোবি আর সুরভী চোখ মেলে তাকায়। সুরভী বলে—
"কি ব্যাপার রে? কিরিস কি লিসিকে একটু বেশি ডোজ দিয়েছে?"
তাদের কথায় ইয়াবি ফিসফিসিয়ে বলে—
"হতেও পারে!"
এত কাছে কথা বলায় হঠাৎ আরোবি চমকে উঠে বলে—
"আরে বাবা! আরেকটু হলে আমার কিডনি বের হয়ে যেত!"
আরোবার কথায় সবাই হেসে ওঠে, আবারও যেন সেই মজার ছন্দ ফিরে আসে মুহূর্তে।
এদিকে, লিসি ধীর পায়ে টেবিলের ওপর থেকে বোতলটা হাতে তুলে নেয়। মাথা নিচু, মুখে কোনো কথা নেই। বোতল হাতে সে জিমের দিকে হাঁটতে থাকে। সেই দৃশ্য দেখে সুপ্রিয়া তাকিয়ে বলে—
"আসলে... লক্ষ্মী মেয়ে!"
লিসি জিমের সামনে গিয়ে নিজে নিজের সাথে বলতে থাকে— "শোন লিসি, তুই যাবি, বোতলটা দিবি, তারপর চুপচাপ চলে আসবি... ব্যস, হয়ে গেলো!"
লিসি একরাশ সাহস নিয়ে বাড়ির পিছনের জিম ঘরের দিকে পা বাড়ায়। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ স্থির হয়ে যায়।
জিমের ভেতরে, কিরিস খালি গায়ে, শুধু ট্রাউজার পরে, শরীরচর্চায় মগ্ন। বহুক্ষণ ধরে ব্যায়াম করায় তার গা ঘেমে ভিজে গেছে। ভোরের নরম সূর্যের আলো কাচ ভেদ করে কিরিসের গায়ে পড়ছে—আর সেই আলোয় তার ঘামের বিন্দুগুলো যেন মুক্তার মতো ঝলমল করছে।
লিসি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে।
কিরিস চোখের কোণ থেকে লিসির দৃষ্টি টের পেয়ে ডাম্বেল নামিয়ে রেখে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে।
কিরিসকে এগিয়ে আসতে দেখে লিসির গলা শুকিয়ে যায়। সে গিলে নেয় একটা শুকনো ঢোক, তারপর অজান্তেই হাতের পানির বোতলের ঢাকনা খুলে ঢক ঢক করে কয়েক ঢোক খেয়ে ফেলে।
কিরিস সামনে এসে পাশের টাওয়াল দিয়ে গা মুছতে মুছতে বলে—
"ওই পানির বোতলটা তো আমার জন্য ছিল, তুমি কেন খেল?"
লিসির ঘোর কাটে।
লিসি হকচকিয়ে বলে—
"কই... ওটা... আমারই পানি ছিল! পিপাসা পেয়েছিলো তাই খেয়ে ফেলেছি।"
কিরিস টাওয়ালটা নামিয়ে এসে লিসির একেবারে কাছে দাঁড়ায়—
"আমি বিশ্বাস করি না... আর এখন তো তেমন গরমও পড়ে নি যে, তোমার এমন তৃষ্ণা লাগবে!"
লিসি কপাল গুঁজে বলে—
"আচ্ছা মুস্কিল তো বাবা! পানি খেয়েছি বলে এবার কি আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি?"
কিরিস চোখ সরু করে বলে—
"না... হঠাৎ করে আমাকে দেখে তুমি পানি খেলো কেন?"
কিরিসের এমন ঘোরানো কথায় এবার লিসির মাথা গরম। রেগে গিয়ে ঢং করে বলে—
"কি করবো বলুন Mr. কিরিস? আপনার 'হটনেস' দেখে আমার গলা শুকিয়ে গেছিলো, তাই পানি খেয়েছি। এবার খুশি?"
কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলে—
"তাই? তাহলে কি একবার ছুঁয়ে দেখবে?"
এই কথায় লিসির গাল লাল হয়ে ওঠে লজ্জায়।
আর কিরিস? ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
লিসি পিছিয়ে দু পা বাড়াতেই পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে।
কিরিস দুই হাত দিয়ে দেয়ালের দুপাশে ঘিরে ধরে লিসিকে।
লিসি মাঝখানে একেবারে ফেঁসে যায়।
সে চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাতে গেলে, কিরিস হাত বাড়িয়ে লিসির থুতনিতে আলতো ছোঁয়া দিয়ে তার মুখ নিজের দিকে ফেরায়।
"এ কী, লিসি র্সামা লজ্জা পাচ্ছে? এ বাবা... নাক দিয়ে তো রক্ত পড়ছে!"
কথাটা শুনে লিসি চোখ কপালে তুলে তড়িঘড়ি করে নাকে হাত দিয়ে দেখে—
"কোথায়? আপনি মিথ্যে বলছেন! সরুন!"
সে কিরিসকে ধাক্কা দিতে গিয়ে থেমে যায়— কারণ কিরিসের গায়ে তখন কিছুই নেই!
লিসি জড়তা কাটিয়ে এক চাতুরীতে কিরিসের হাতের নিচ দিয়ে বের হয়ে দৌড় দিয়ে বেরিয়ে যায়।
পিছনে কিরিস হেসে ফেলে।
বাইরে এসে লিসি বুকে হাত দিয়ে দাঁড়ায়—
"বেঁচে গেছি বাবা!"
তারপর মুচকি হেসে বলে—
"কিন্তু ভাইয়া বডিটা আসলেই অনেক হট ছিল... ধ্যাত! কি সব ভাবছিস তুই লিসি!"
লিসি লিভিং রুমে ঢুকে দেখে আনোয়ার আর আনারুল গার্ডেন থেকে এসে ছোপাতে বসেছে।
রান্নাঘর থেকে প্রিয়া ডাক দেয়—
"রান্না কিন্তু প্রায় শেষ। কমলা, তুই ডাইনিং টেবিলে প্লেটগুলো সাজা।"
লিসি ছোপাতে বসতেই আরোবি এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে—
"কি ব্যাপার, কিরিস কি তোকে বেশি বকেছে?"
লিসি মাথা নাড়িয়ে কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ নামিয়ে রাখে।
ততক্ষণে কিরিস বাড়ির ভিতরে ঢুকে বলে—
"সবাই সকালের নাস্তা করে নাও। আমরা একটু পরে বের হবো। মা, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।"
তার গলায় গম্ভীর টান, সবাই চুপচাপ শুনে।
আনোয়ার উঠে দাঁড়িয়ে বলে—
"চলো সবাই নাস্তা করে নেই।"
ডাইনিং টেবিলে সবাই নিজের মতো বসে খেতে থাকে।
সুপ্রিয়া ডেকে ওঠে—
"আই, কিরিস!"