উপন্যাস : তোমাকে চাই

লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা

ঝালমুড়ি হাতে পেয়ে লিসি খুশিতে ডগমগ করে হাঁটছে।
পেছনে তাকায় না একবারও।
হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে...
কিরিস আসছে। হাতে ব্যাগ, আর... ছেঁড়া জুতো!
চোখ ছলকে ওঠে।

—"এই ছেঁড়া জুতো আপনি নিয়ে ঘুরছেন কেন! ব্যাগটা দিন আমার।"
লিসি ব্যাগ নিতে গেলে কিরিস সেটা মাথার উপর তোলে।
—"থাক, আমি নিচ্ছি। তুমি খালি পায়ে হাঁটছো কেন? ব্যথা পাবে।"
—"উফ! এখানকার ঘাস দেখে তো মনে হচ্ছে সব তুলোর মতো, ব্যথা পাবো না। আপনি আসেন। আর... খাবেন?"
কিরিস মুখ ঘুরিয়ে বলে —
—"তুমি খাও, আমি এসব খাই না!"
—"তাহলে এই জুতো ফেলে দিন!"
কিরিস কিছু না বলে জুতোটা আরো শক্ত করে ধরে।
মনে মনে বলে —
“এই জুতো আমি ফেলতে পারি, কিন্তু অন্য কেউ যদি এই জুতো ছুঁয়ে ফেলে, যে জুতোর সঙ্গে তোমার পায়ের ছোঁয়া লেগেছে—তা আমি মেনে নেবো না। এটা শুধু ডাস্টবিনে যাবে।”
কিরিস লিসির দিকে তাকিয়ে আছে,দুজনের চোখে চোখ পরে যায়, লিসি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে বলে —" এখানে আসেন "
একটা ডাস্টবিন পেয়ে কিরিস সেখানে জুতো ফেলে দেয়।
লিসির কাছে ফিরে এসে বলে —
—"হুম, এসেছি এবার।"
লিসি মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকায়।
—"আমাকে ধরুন তো... আমি এই থামের উপর উঠবো।"
কিরিস চমকে যায় —
—"মানে! এখন এইখানে উঠবে তুমি?"
—"হুম, ধরুন না!"
এই নদীর পাড় ঘেঁষে একটা ছোট্ট ব্রিজ,
চওড়া মোটা মোটা খাম দিয়ে তৈরি, যেন কারও বিশাল কাঁধ।
এই ব্রিজে বসে গল্প করে সবাই—
জুতো খুলে পা ঝুলিয়ে দেয় কেউ কেউ,
আবার কেউ বসে শুধু আকাশ দেখে।
আর ঠিক তখনই,
লিসির মনে খেয়াল চাপে—
এই মোটা খামের উপর দিয়ে হাঁটবে সে।
হয়তো নিজেকে একটু অন্যরকম করে দেখার ইচ্ছে,
হয়তো একটু দুষ্টু সাহসী কিছু করে কিরিসের মনোযোগ নেওয়ার চেষ্টা।
কিরিস কিছু না বলে লিসিকে ধরে তুলে দেয়।
লিসি উঠে পড়ে থামের উপর।
সে যেন ছুঁয়ে ফেলে একটুখানি স্বাধীন আকাশ।
—"এখন তো আমি আপনার চেয়ে লম্বা!"
কিরিস হাসে —
—"কোথায়, আমি তো কিছু দেখছি না!"
—"উফ! আপনি বুঝবেন না! আমি হেঁটে যাবো এই মোটা খামের উপর দিয়ে!"
কিরিস চোখ সরু করে —
—"পড়েও যেতে পারো।"
—"আপনি আছেন কি করতে! ধরবেন না?"
এই বলে সে কিরিসকে হাত বাড়ায়।
কিরিস সেই হাত ধরে রাখে।
একসাথে হাঁটতে থাকে—উপরে লিসি, নিচে কিরিস।
দুজনের ছায়া একে অপরের সঙ্গে খেলা করে।
ব্রিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে লিসি নামতে যায়।
কিরিস ধীরে ধীরে নামিয়ে দেয়, কিন্তু নামার সময়েও তার চোখ শুধু লিসির মুখে।
লিসি এগিয়ে যায়।
হঠাৎ কিরিস তার হাত ধরে ফেলে —
—"খালি পায়ে হাঁটছো, পা কেটে যাবে!"
—"বললাম তো কিছু হবে না! ছাড়েন আমার হাত! কান্না করে দেবো!"
কিরিস বুঝতে পারে, এই মেয়ে কান্নার ভয় দেখিয়ে সব আদায় করে নেয়।
কিন্তু এবার নয়।
সে লিসিকে নিজের কাছে টেনে আনে।
কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় বলে —
—"একটা কথা শুনলে ভালো হয়। না শুনলে পার্কিং সেন্টারে যা করেছিলাম, এবার সব্বার সামনে করবো। ভেবো না আমি লজ্জা পাবো।"
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকায়, গলার স্বর খানিক কাঁপা —
—"কি সব বলছেন আপনি! একটু লজ্জা করছে না আপনার?"
কিরিস ঠান্ডা গলায়, কিন্তু চোখে বিদ্যুৎ ঝলকে বলে —
—"বললাম না? আমি নির্লজ্জ। বেয়াদব, বেহায়া, ছন্নছাড়া—সবই। তাই এসব করতে আমার লজ্জা লাগে না।
তোমাকে এমন ভাবে ধরবো বুঝতে পেরেছো,,এখন এখান থেকে নড়া তো দুরের কথা,,বাড়ি হেঁটে যেতে পারবে কিনা অভরসা , এটা আমি জানি।"
লিসি থ হয়ে যায়। এমন হুমকিতে জিভ যেন তালুতে আটকে যায়।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই...
হুট করে কিরিস লিসিকে কোলে তুলে নেয়।
এক হাতে ব্যাগ, আর আরেক হাতে... লিসি।
—"আরে! নামান! কি করছেন আপনি? নামান বলছি!"
লিসি ছটফট করতে থাকে।
কিন্তু কিরিস শক্ত করে ধরে বলে —
—"আরেকটু নড়লে এই ব্রিজের ওপর থেকে সোজা পানিতে ফেলে দেবো।"
লিসি গাল ফুলিয়ে বলে —
—"আরে আপনি তো সবসময় ওখান থেকে এখান থেকে ফেলে দিতে চান!"
কিরিস এবার আর একটাও কথা শোনে না।
চোখে একরোখা জেদ, ঠোঁটে চাপা হাসি, পায়ে শক্ত ভর দিয়ে সে সবার মাঝ দিয়ে কোলের মধ্যে লিসিকে নিয়ে হাঁটতে থাকে।
নদীর পাড়ে এসে পৌঁছায় তারা।
যার জন্য আসা—সেই সূর্য ডোবার দৃশ্য—তা দেখা হলো না।
সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে।
কিন্তু চারপাশে এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে আছে।
বাতাসে সন্ধ্যার গন্ধ।
ঘাসে ঘাসে শিশির ছুঁই ছুঁই।
পানির ওপরে ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে গেছে চাঁদের রূপালি আলো।
কিরিস লিসিকে আস্তে করে ঘাসের ওপর বসিয়ে দেয়।
নিজেও পাশে বসে।
দুজনের মাঝে মাত্র এক-দুই আঙুল দূরত্ব।
তবু এই দূরত্বটাই যেন মহাকাশ।
নীরবতা... এত গাঢ় যেন শব্দ হলেও সেটা কাঁপে না, ভাঙে না।
লিসি আকাশের দিকে তাকিয়ে।
ছোট ছোট তারা, কিছু দূরের লাইট ভেরুর আলো, আর নদীর জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব—সবকিছুতেই তার চোখ আটকে।
আর কিরিস?
সে তাকিয়ে আছে শুধু লিসির দিকে।
চোখ যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে ওর মুখে মুখে।
চুলের ফাঁকে, চোখের পাতায়, ঠোঁটের নড়াচড়ায়...
লিসি জানে না, এই মুহূর্তটা ঠিক কতটা গভীর হয়ে গেছে।
বেশ কিছু ক্ষণ লিসি চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে ছিল। চারপাশে হালকা বাতাস, নিস্তব্ধ রাত… যেন পুরো পৃথিবী থেমে গেছে।
একটা সময় সে আনমনে কিরিসের কাঁধে মাথা রাখে।
কিরিস খানিক নড়ে উঠে তার দিকে তাকায়। হাওয়ায় লিসির চুলগুলো মুখের চারপাশে এলোমেলো উড়ছে। তাদের মাঝে আর কোনো দূরত্ব নেই।
চোখে চোখ পড়তেই কিরিস আস্তে করে লিসির হাত মুঠো করে ধরে। লিসিও শক্ত করে ধরে রাখে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিরিস বলে—
কিরিস — “এবার চলো… না হলে দেরি হয়ে যাবে। তূর্যকে আনতে হবে।”
লিসি উঠে দাঁড়ায়। কিরিস ফোন বের করে আনোয়ারকে কল দেয়—
📞
কিরিস — “বাবা… কোথায় তোমরা?”
আনোয়ার — “এইতো, গাড়িতে উঠছি। আলহামদুলিল্লাহ, সব কাজ শেষ। বিয়েটা ভালোয় ভালোয় হয়ে গেল।”
কিরিস — “রিহান আর নুসরাত কোথায়?”
আনোয়ার — “নুসরাত সামনে বসে আছে। কান্নাকাটি করছে। রিহানও আছে। আমরা রওনা হচ্ছি। তুই বাড়ি চলে আয়। আর লিসিকে দেখেশুনে আন।”
কিরিস — “ঠিক আছে। আমি তূর্যকে নিয়ে আসছি।”
ফোনটা কেটে দিয়ে কিরিস আবার লিসির দিকে তাকায়। দেখে, লিসি মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে।
কিরিস — “কি হয়েছে আবার?”
লিসি (ঠোঁট বাঁকিয়ে) — “আপনি পচা…! আপনার জন্য আমি বিয়ের শেষটা দেখতে পারলাম না! সবাই নিশ্চয়ই অনেক মজা করেছে… ইস্‌… আমি যদি থাকতে পারতাম…”
কিরিস (হেসে) — “তা হলে এখন আমাদের এই সুন্দর ডেটটা কি হতো? কিছু পেতে হলে কিছু খোয়াতে হয়, বুঝেছো লিসি।”
লিসি — “উফ! আমার সাথে আপনি কথা বলবেন না! আমার রাগ হচ্ছে! আপনি খুবই পচা!”
কিরিস — “এই কথাটা তো আমার বুকে লাগলো! একটু হলে হৃদয় ভেঙে যেতো…”
লিসি (ভ্রু কুঁচকে) — “আপনি তো বেশ ফ্লার্ট করতে পারেন! আর আপনার হৃদয় আছে, এটাও জানা ছিল না।”
কিরিস — “এই পৃথিবীতে কাউকে দেখেছো হৃদয় ছাড়া?”
লিসি কিছু না বলে হেঁটে যেতে থাকে।
হঠাৎ পেছনে আঁচলে টান লাগে…
পেছন ফিরে দেখে—
কিরিস তার শাড়ির আঁচল ধরে রেখেছে…
কিরিসের চোখে মায়াবী একটা তীক্ষ্ণতা ঘুরছে। সেই চোখে এমন এক যাদু, যা লিসির হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। যেন চোখেই কথা বলে ফেলছে ও।
হঠাৎ কিরিস গুনগুন করে গেয়ে ওঠে—
> "Haal jo mera hai main kisko bataun? Mere…
Sahiba dil naa kiraaye ka,
Thoda toh sambhaalo naa,
Naazuk hai yeh, toot jaata hai..."
লিসি হতবাক… এত মেলোডি কিরিসের গলায়?
আর প্রতিটি লাইন যে তাকে উদ্দেশ্য করেই, সে সেটা হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে…
কিরিস হঠাৎ দ্রুত এগিয়ে আসে, পিছন থেকে কোমরে জড়িয়ে ধরে…
তার বুক লিসির পিঠে, মাথা ঝুঁকে ঘাড়ের কাছে—
"Saheba neendein veendein aaye naa
Raatein kaati jaaye naa
Tera hi khayaal din rain aata hai!"
নীরবতা নেমে আসে…
লিসি একটুও নড়তে পারে না।
কিরিসের গরম নিশ্বাস ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে…
লিসি (ধীরে, কাঁপা গলায়) —
"ভাইয়া… ছাড়ুন… আমরা না কোথাও যাবো?"
কিরিস নিজের মুখ তোলে, স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠেছে।
সে চেয়েছিলো আরেকটু সময়… লিসিকে নিজের বুকে রাখার।
কিন্তু তা আর হলো না।
চোখ নামিয়ে লিসিকে ছেড়ে দেয়।
লিসি হাঁটা দিতে গেলেই,
পেছন থেকে কিরিস শক্ত গলায় বলে—
“কই যাও, দাঁড়াও… আর যদি না শোনো, তাহলে শেষ!”
এরপর আর এক মুহূর্ত না গিয়ে
লিসিকে কোলে তুলে নেয়।
রাত হয়ে গেছে, রাস্তা অন্ধকার।
কিরিস জানে — এই পথের ধুলোতেও সে লিসির পা লাগতে দেবে না।
লিসি কিচ্ছু বলে না, চুপচাপ কিরিসের কোলে মাথা গুঁজে থাকে।
চলতে চলতে লিসির চোখে পড়ে এক জুতার ভ্যান।
লিসি (আস্তে) —
“ভাইয়া… ওখানে চলুন, একটা জুতো কিনে নিই… তাহলে আর আপনাকে এভাবে কষ্ট দিতে হবে না।”
কিরিস কিছু না বলে সামনে এগিয়ে যায়।
আশপাশের লোকেরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে…
এই অপরূপ যুগলকে — ছেলেটা কোলে করে মেয়েটিকে নিয়ে যাচ্ছে,
মেয়েটা আকাশি শাড়িতে, এলোমেলো চুলে অস্থির…
অস্বস্তিতে কাচুমাচু করে বলে—
“ভাইয়া… নামিয়ে দিন… সবাই দেখছে…”
কিরিস (ঠান্ডা গলায়) —
“না… পায়ে ধুলো লাগবে। এভাবেই বেছে নাও কোনটা নেবে।”
লিসি আর কিছু না বলে কোলে বসেই একজোড়া জুতো বেছে নেয়।
দোকানদার যখন জুতোটা দেয়—
কিরিস হঠাৎ বলে ওঠে —
“আরেক সাইজ বড় দাও, এটা ছোট হবে।”
লিসি থমকে যায়।
কিরিস কীভাবে জানলো তার পায়ের সাইজ?
দোকানদার হেসে আরেকটা সাইজ দিয়ে দেয়।
কিরিস নিজ হাতে জুতো নিয়ে সামনে থাকা বেঞ্চে লিসিকে বসিয়ে দেয়।
নিজে হাঁটু গেড়ে বসে, তার পায়ে হাত দিতে গেলে লিসি রেগে বলে—
“ভাইয়া… কী করছেন! আমি নিজেই পারব…”
কিরিস (রাগে) —
“এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো… চুপচাপ বসে থাকো।”
লিসি চুপ…
কিরিস নিজের হাতে খুব যত্ন করে
লিসির পায়ে জুতো পরিয়ে দেয়।
পরে সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে—
“কটন ক্যান্ডি খাবে?”
লিসি তাকিয়ে থাকে… কিছু বলে না।
তবে চোখে একটা চাহনি আছে,
যা কিরিস খুব ভালো করেই পড়ে ফেলে।
ওয়ালেট বের করে কিরিস লিসির হাতে দেয়।
লিসি তো অবাক!
কিরিস পাশে বসে বলে—
“যাও… জুতার টাকা আর যেটা খেতে মন চায়, কিনে নাও।
তোমাকে আমি ১০ মিনিট দিচ্ছি। যাও…”
লিসি কিছু না বলেই অবশেষে উঠে যায়…
আস্তে আস্তে জুতার দোকানে গিয়ে টাকা দেয়।
আর কিরিস সেই সাদা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে…
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে —
এই মেয়েটার জন্য সে আর কী না করতে পারবে?
লিসি দোকানদারের হাতে টাকা তুলে দেয়।
দোকানদার একটু অবাক হয়ে তাকায় কিরিসের দিকে,
তারপর লিসির দিকে মুচকি হেসে বলে—
“ম্যাডাম, এমন ছেলে কপালে করে পাওয়া যায়…
কোলে করে নিয়ে আসা, নিজের হাতে জুতো পরানো—
ভাগ্য না থাকলে হয় না…
আপনার তো চোখে বুঝি ভালোবাসারই ছায়া।”
লিসি কিছু বলে না।
শুধু হালকা মাথা নিচু করে থাকে।
তবে মনের ভেতর যেন একটা অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে…
অভিমান, লজ্জা, প্রশ্রয়—সব মিলিয়ে তার মনে এক অনির্বচনীয় শান্তি।
সে ধীরে ধীরে ফিরে আসে কিরিসের কাছে।
ততক্ষণে কিরিস এক কোণায় দাঁড়িয়ে আছে,
কটন ক্যান্ডি বিক্রেতাকে নিজের কাছে ডেকে এনে
ওখান থেকে ৫-৬টা গোলাপি কটন ক্যান্ডি বের করে।
হাত বাড়িয়ে একটানা সেগুলো লিসির হাতে দেয়—
“তুমি তো কিছু চাইলে না, আমি নিজেই বুঝে নিলাম…”
লিসি চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে।
কটন ক্যান্ডি হাতে পেয়েই তার মুখে যেন শিশুদের মতো একটা মহা খুশির হাসি।
হাসতে হাসতে ওরা রওনা দেয় গাড়ির দিকে।
রাস্তার এক পাশে চোখে পড়ে—
একটা বালতির মতো ফুলের ঝুড়ি,
একজন ছেলে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ফুল বিক্রি করছে।
কিরিস হঠাৎ থেমে যায়।
ঝুড়ির ভেতর থেকে সে একটা লাল গোলাপ টেনে তুলে নেয়,
আরও বেশ কিছু টাকা দিয়ে দেয়।
ছেলেটা মৃদু হাসে।
গোলাপটা হাতে তুলে খুব আলতো করে,
কোনো কথা না বলে, চোখে চোখ রেখে লিসির হাতে তুলে দেয়।
লিসি কিছু বলেই না,
তবে গোলাপটা হাতে নিয়েই যেন শরীর নিথর হয়ে যায়।
অপলক তাকিয়ে থাকে তার সেই ‘পচা’ ভাইয়ার মুখে।
তারপর দু’জন গাড়িতে উঠে বসে।
সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতেই কিরিস গাড়ি স্টার্ট দেয়।
লিসি একহাতে গোলাপ, অন্যহাতে কটন ক্যান্ডি…
চোখে এক অপূর্ণ অথচ পরিপূর্ণ ভালোবাসার ঝিলিক।
গাড়ি এগিয়ে যায়…
তূর্যকে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে…
আর পেছনে পড়ে থাকে এক স্নিগ্ধ রাতের স্পর্শ।
দূরপাল্লার পথ, তবুও গন্তব্যের দিকে ছুটে চলছে তাদের গাড়ি।
দিনাজপুরের অর্ধেক পথ পেরিয়ে এসেছে তারা। সময় প্রায় রাত আটটা। চারদিক নিস্তব্ধ, রাজপথ যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। কয়েকটা ট্রাক আর দু’একটা গাড়ি ছাড়া রাস্তা প্রায় ফাঁকা।শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে চারদিক। সড়ক ফাঁকা, মাঝে মাঝে কয়েকটা ট্রাক আর দূরবর্তী হেডলাইটের আলোয় ছায়াময় হয়ে থাকা রাস্তার পাশে গাছগুলো যেন নিঃশব্দ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লিসি কনট ক্যান্ডি চুষতে চুষতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। ক্লান্তি যেন চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়েছে তার। হঠাৎ পুরনো অভ্যাসে চোখ বন্ধ করে কিরিসের পাশে ঘুমিয়ে পড়ে সে। পাতলা শাড়ির মধ্যে রাতের ঠান্ডা হাওয়ায় কেঁপে উঠছে ওর শরীর।
কিরিস কিছুক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে যায়। তারপর গাড়ি এক্সসাইডে দাঁড় করায়। নিজের গায়ের ব্লেজারটা খুলে ধীরে ধীরে লিসির গায়ে জড়িয়ে দেয়। কোনো কথা নেই, কেবল স্পর্শের মাধ্যমে যেন মমতা ঢেলে দেয়।
গাড়ি আবার চলতে থাকে। লিসি গুটিসুটি মেরে বসে। কিরিস লক্ষ করে—শরীরটা এখনো কাঁপছে একটু একটু করে
পাতলা শাড়ির ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপছে লিসির শরীর। গোলাপফুলটা তখনো শক্ত করে ধরে আছে হাতে।
কিরিস একবার ওর দিকে তাকায়। গাড়ির স্পিড কমিয়ে দেয়।চোখ সরিয়ে নেয় না।
গাড়ি একটু সাইডে দাঁড় করিয়ে, নিঃশব্দে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে—
লিসির হাত থেকে গোলাপফুল আর ব্যাগটা নিচু হয়ে নিয়ে সামনের স্পেসে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে ওকে টেনে নিজের কোলে তুলে আনে।
একটা হাত মাথায়, আরেকটা কোমরে—শিকারির মতো আগলে রাখে ওকে।
নিজের গায়ের ব্লেজারটা জড়িয়ে দেয় লিসির গায়ে, খুব যত্ন করে।
তারপর সিটবেল্ট টেনে দুজনকে একসাথে আটকে ফেলে। যেন এক বিন্দু ঠান্ডাও ওকে স্পর্শ করতে না পারে। যেন একটা প্রাচীন শপথ—এই মেয়েটার গায়ে একটাও দুঃখ আসবে না।একহাতে লিসিকে বুকের কাছে ধরে, আরেক হাতে গাড়ি চালাতে শুরু করে কিরিস।লিসির একটা বাজে অভ্যাস আছে। সে একবার ঘুমিয়ে পড়লে কিছুই টের পায় না—ঘরের আলো জ্বলে থাকুক, বাইরে বৃষ্টি হোক, কিংবা গায়ে কারও হাত—সব যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। ঘুমের ভেতরেই যেন ওর আলাদা একটা দুনিয়া আছে, আর সেখানে পৌঁছানোর পর কিছুই আর মনে থাকে না।
কিরিসের বুকের ওপর মাথা রাখা অবস্থাতেও লিসি একটুও সচেতন না। কিরিসের গায়ের উষ্ণতা আর নরম শ্বাসের ছন্দে যেন ও নিজেকে একেবারে হারিয়ে ফেলেছে।
সে জানে না কোথায় যাচ্ছে, রাস্তাটা কতটা লম্বা, চারপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে… শুধু জানে— এখন তার বুকের তলা ভরপুর নিরাপত্তায়, উষ্ণতায় আর ঘুমে ভেজা শান্তিতে ডুবে আছে।
কিরিস একবার তাকিয়ে দেখে লিসির মুখে একটা ছোট্ট শিশুর মতো প্রশান্তির হাসি। চোখের কোণে চুল লেগে আছে, ঠোঁট কনট ক্যান্ডির রঙে হালকা গোলাপি।
সে আবার মুচকি হেসে বলে, নিজের মনেই—
"এই মেয়েটা ঘুমাতে জানে... কিন্তু টের পায় না, কার কোল জুড়ে ঘুমাচ্ছে।"
বাহিরের অন্ধকার ছুটে যাচ্ছে, আর ভেতরে আলো-আঁধারির মাঝখানে কিরিসের কোলে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে লিসি। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গায় আছে সে।
গাড়িটা অনেকটা এগিয়ে যায়। তখনই সামনে পড়ে একটা পুলিশ চেকপোস্ট। কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে, হাতে টর্চ, মুখে সন্দেহ।
—"এই গাড়ি থামা!"
কিরিস শান্তভাবে গাড়ি থামায়।
একজন পুলিশ এগিয়ে এসে টর্চ মারে কিরিসের মুখে। তারপর নিচু হয়ে দেখে লিসিকে।
—"এই রে! কোলে বসিয়ে ঘুরছিস! বাড়ি যেতে পারছিস না, তাই গাড়িতেই শুরু করেছিস নাকি?"
—"এই মেয়ে, নাম! এভাবে ছেলের কোলে শুয়ে থাকিস? নষ্টা কোথাকার!"
চোয়াল শক্ত করে ফেলে কিরিস। এতক্ষণ চুপ ছিল।
"একবারই বলছি—মুখ সামলে কথা বলুন। যার সম্পর্কে কিছু জানেন না, তাকে নিয়ে কথা বলবেন না। আর... ও আমার ওয়াইফ।"
পুলিশটা হেসে ফেলে।
—"তোর ওয়াইফ নাকি! হা হা! কে তুই রে? রাজা-বাদশাহ? তুই কি ভাবছিস যে টাকা না দিলেই চলবে? ১০,০০০ টাকা দে, নাহলে গাড়ি যাবে না। আর ওই মেয়েটার চুল ধরে টেনে নামাবো বুঝলি?!"
লিসি একটু নড়ে ওঠে, নাকের নিচে নিঃশ্বাসটা জোরে পড়ে। কিরিস ধীরে হাতটা ওর মাথার উপর রাখে। স্নেহে নয়—সুরক্ষায়।
"কিছু হয়নি, তুমি ঘুমাও…"
চোখের পাতা না ফেলে তাকায় পুলিশটার দিকে।
"ওকে ছোঁয়ার আগে আয়নায় নিজের মুখটা দেখে নিস। ওর গায়ে দাগ পড়লে, আয়নায় নিজেকে চিনতে পারবি না।"
পুলিশটা আরেকটু এগিয়ে আসে।
—"এই! বেশি নাটক করিস না, তুই...!"
—"যদি কোনও লাস্ট উইশ থাকে, এখন বল। কারণ আগামী এক মিনিটের মধ্যে তুই মরতে চলেছিস।"
পুলিশটা থমকে যায়। তার গলার স্বর শুকিয়ে আসে। সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে যে 'কিরিস'—এই নামটা শোনার পর বহু মানুষ জীবনে কথা ভুলে গেছে।
—"তুই কি ভেবেছিস... তোকে ছেড়ে দেব?"
আরও একটা বাক্য বেরোনোর আগেই—টাক!
সোজা বন্দুক বের করে মাথার মাঝ বরাবর গুলি করে কিরিস।
মাথার পেছনটা উড়ে যায়। রক্ত ছিটকে পড়ে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে।
তবুও, তার কোলে শুয়ে থাকা মেয়েটার ঘুম ভাঙে না।
একটা হাত লিসির মাথায়, অন্যটা কোমরে রাখা।
একটা হিংস্র শিকারি যেভাবে তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটাকে আগলে রাখে, ঠিক সেভাবে জড়িয়ে রেখেছে কিরিস।
তার চোখ অন্ধকারে জ্বলছে, গলার স্বর নিস্তব্ধ...
"তোর শরীর এখনো গরম… কারণ গুলিটা আমি তাজা দিয়েছি।
কিন্তু ভাগ্য ছিল তোর... ও ঘুমিয়ে আছে। জেগে থাকলে, তোর লাশ এত সুন্দর থাকতো না।"
গুলি চলার আওয়াজে আশপাশের আরও পুলিশ ছুটে আসে।
তাদের মধ্যে একজন কিরিসকে দেখে পিছিয়ে যায়। তার মুখ শুকিয়ে যায়। কোনোমতে বলে—
—"স্যার... মাফ করে দিন। ভুল হয়েছে। ওরকম কথা বলা উচিত হয়নি ওনার..."
কিরিস দাঁতে দাঁত চেপে বলে—
"ভুল নয়, পাপ। আজকে শুধু মৃত্যু হয়েছে। যদি পারতাম, মৃত্যু থেকেও বড় শাস্তি দিতে তাহলে সেই শাস্তি দিতাম। ওই পশুরা এমনই শাস্তির যোগ্য,জানোয়ারের বাচ্চা কত সাহস আমার লিসিকে বাজে বলে"
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলে,
"এই কথাটা এখানেই থাক। বাইরে গেলে... পরেরবার এখানে সবাইকে কবর দিতে হবে।"
চারদিকে নিস্তব্ধতা। কেউ কোনো কথা বলার সাহস পায় না।গাড়ি আবার চলতে থাকে।
লিসির নিঃশ্বাস ধীরে ওঠানামা করে। কিরিস এক মুহূর্তের জন্য ওর মুখের দিকে তাকায়।
চুল সরিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে বলে—
"ঘুমিয়ে থাকো, অলকানন্দা …
এই পৃথিবীর কোথাও—তোমার চোখের পাপড়ির ওপর একটা ধুলাও পড়তে দেবো না।
এই হাতটা রক্তে ভিজে থাকলেও, তোমার শান্ত ঘুম রক্ষা করতেই শিখেছে।"
কিরিস আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখে। গাড়ির চাকা গড়িয়ে চলেছে অনেক দূর। ঢাকার শহর ক্রমশ ধরা দিতে থাকে—আলো ঝলমলে, চঞ্চল, ক্লান্ত একটা শহর। আশেপাশের সব কিছু যেন তার উপস্থিতিতে নিজেকে থামিয়ে দেয়।
একটা বড় বিল্ডিংয়ের সামনে এসে গাড়িটা থামায় কিরিস। নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা চোখে সানগ্লাস, কাঁধে একটা ব্যাগ, মুখভর্তি হালকা দাড়ি—তূর্য। ছোটবেলা থেকে তার একমাত্র বন্ধু।
তূর্য এগিয়ে আসে, কিরিসের কোলে ঘুমন্ত মেয়েটিকে দেখে এক মুহূর্ত থমকে যায়। ব্যাগটা নেয়ার ভান করলেও চোখ পড়ে কিরিসের কোলে। ভ্রু কুঁচকে বলে—
তূর্য: “আমি ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তো? নাকি তুই ঠিক নেই?”
কিরিস: (শান্ত গলায়) “মানে?”
তূর্য: “তোর কোলে মেয়ে! আরে ভাই, যদি তোর কোলে নিউক্লিয়ার বোমা থাকতো তাহলে আমি হজম করে নিতাম। কিন্তু তুই? তুই তো মেয়েদের দেখলে সাইড হয়ে দাঁড়াস—এখন কোলে জড়িয়ে ধরে রাখছিস?”
কিরিস: “তোর মনে হয়, আমি সাধারণ মেয়েকে এভাবে রাখি?”
তূর্য: “মানে… মানে… এই তাহলে আমার ভাবি…! প্রথম ভাবি…”
কিরিস: (কিঞ্চিৎ বিরক্ত মুখে) “প্রথম ভাবি মানে কি? এর আগে কি কাউকে গাড়িতে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলাম? ওঠ গাড়িতে, না হলে তোর জন্য রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছি।”
তূর্য: “সরি সরি! আমি তো জাস্ট মজা করছিলাম। প্রথমবার তো, একটু হজমে সমস্যা হয়েছে।”
কিরিস: “হুম, এবার গাড়িতে ওঠ।”