উপন্যাস : তোমাকে চাই

লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা
পর্ব:১৫

সে একটা শুকনো ঢোঁক গিলে নেয়।
নিজেকে থামাতে কষ্ট হচ্ছে…
আরেকটু যদি দেরি হয়, নিজেকে সামলাতে পারবে না।
সে এবার একটু জোরে বলে ওঠে —
– "লিসি! আমরা বিয়ের বাড়ি চলে এসেছি, ওঠো!"



লিসি এবার আস্তে আস্তে চোখ মেলে… ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলে,
"চলে এসেছি?"
 "হুম, এবার ওঠো।"

লিসি প্রথমে কিছু বুঝতে না পারলেও, খানিক তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই নিজের অবস্থান টের পায়…!

তড়িঘড়ি করে উঠে বসে, হঠাৎ বলে ওঠে —
– "আহ... আপনি আমার এতো কাছে...!"

সে দ্রুত কিরিসের বুক থেকে সরে যেতে গিয়ে আবারও ধাক্কা খায় — সিটবেল দিয়ে বাঁধা থাকায় সোজা আবার কিরিসের বুকেই পড়ে।

– "আহ্....!"
লিসি চেঁচিয়ে ওঠে।

– "চুপ করো, আগে সিটবেল খুলতে দাও!" – ধমক দিয়ে বলে কিরিস।
সিটবেল খুলে কিরিস পাশে তাকাতেই দেখে, একজন মধ্যবয়সী লোক সামনে এগিয়ে আসছে। মুহূর্তেই সে লিসির কোমর জোরে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকে মিশিয়ে ফেলে।

লিসি ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে গেলে, কিরিস ফিসফিস করে বলে —
– "এভাবে থাকো… সামনে বাবার পরিচিত লোক আসছে। যদি তোমাকে আমার কোলে বসে থাকতে দেখে তাহলে তুমি তো শেষ… লিসি শার্মা। তাই মুখ লুকিয়ে থাকো যাতে কেউ তোমাকে চিনতে না পারে।"

লিসি তো চমকে যায়!
বাড়ির লোক জানলে শেষ কেলেঙ্কারি হবে ভেবে, সত্যি সত্যিই সে কিরিসের বুকে মুখ লুকিয়ে নেয়। তার লম্বা খোলা চুলে মুখটাও ভালো করে ঢেকে যায়।

আর কিরিস?
এই সুযোগে তার বুকের সঙ্গে লিসিকে জড়িয়ে ধরে, নরম ভাবে...

লোকটা অবাক হয়ে বলে —
– "বাবা! এই মেয়েটা কে?"
কিরিস শান্ত গলায় উত্তর দেয় —
– "বুঝতে পারছেন না কে হতে পারে?"
– "আমাদের বউমা নাকি?" – মুচকি হাসে লোকটা।
ভেতরে ভেতরে লিসি জ্বলছে,
"শালার হিটলারের সঙ্গে আসলে কেন এসব হয়!"

– "হুম, আমার বউ।" – বলে কিরিস।

– "তা মুখটা দেখি একবার?"
– "না, ও একটু লাজুক। আর এখনই ঘুম থেকে উঠেছে। পরে দেখেন, এখন ডিস্টার্ব করবেন না।"

– "সত্যি তুই বিয়ে করেছিস! আমাদের জানাস নি কেন?"
– "বিয়ে করলেই যে জানাতে হবে এমন কোনো কথা আছে?"

লোকটা এবার আর কথা বাড়ায় না। সে জানে, কিরিসের সঙ্গে তর্ক মানেই নিজেই হেরে যাওয়া।

লোকটা চলে যেতেই লিসি উঠে বসে, গাড়ি থেকে নামতে গেলে কিরিস বলে —
– "দাঁড়াও, আমি নামিয়ে দিচ্ছি।"

কিরিস গাড়ির দরজা খুলে লিসিকে কোলে নিয়েই ঘুরে বসে। লিসি এবার নিচে নামার আগেই কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে —
– "আমি আপনার কোলে আসলাম কীভাবে?! নিশ্চয়ই আপনি এমনটাই করেছেন... দুষ্টু লোক!"
কিরিস হেলান দিয়ে হাসতে হাসতে বলে —
– "কোথায়? তুমি তো ঘুম ঘোরে আমার কোলে এসে বসে ছিলে! আমি ছাড়াতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আরও কাছে টেনে নিলে।"

– "মিথ্যা! আমি এমন কখনোই করিনি। আপনি মিথ্যা বলছেন!" – রাগ করে লিসি।

– "আমি মিথ্যা বলবো কেন? তুমি তো নিজের চোখেই দেখলে কিভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসেছিলে। তার মানে, লিসি শার্মা... তুমি আমাকে...!"

– "আ...হ না! আমি এমন না! আপনার সঙ্গে কথা বলাটাই ভুল!" – বলে লিসি গটগট করে এগিয়ে যেতে লাগে।

কিরিস পিছন থেকে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে —
– "তোমার ঠোঁটটা সত্যিই মিষ্টির মতো নরম।"

লিসি পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলে —
– "ছেঁড়া হিটলার! গণ্ডার!"

বলেই সে রাগে গজগজ করতে করতে সামনে গিয়ে সবাইকে সাথে মিশে যায়।
বিয়ের গেটের সামনে এখন একেবারে হোইহোই রইরই অবস্থা। চারদিকে হৈ-হল্লা, হাসির ঝলকানি। গেটের পাশে একটা টেবিল রাখা হয়েছে, তাতে সাজানো মিষ্টি আর ঠান্ডা শরবত। সামনে দাঁড়িয়ে রিহান, চোখে মুখে একরাশ আনন্দ।

নুসরাতের মা মাবেনা এগিয়ে এসে রিহানকে মিষ্টিমুখ করান, তারপর নিজ হাতে এক গ্লাস শরবত তুলে দেন। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন ইশানের মা সাবেনা, ইয়াবির মা, আরও কয়েকজন ফুফু।
রিহান হাসিমুখে সবই গ্রহণ করে।

মিষ্টি-শরবতের পর্ব শেষ হতেই ইশান মুখ কুঁচকে বলে —
ইশান: “আম্মু! আজকে তো আপনি একদম আমার বিপক্ষে দাঁড়াইয়া গেলেন!”
সাবেনা খিলখিলিয়ে হাসে — “তুই যেমন তোর ভাইয়ের পক্ষে, আমরা তেমন আমাদের মেয়ের পক্ষে।”

এদিকে ইয়াবি এগিয়ে এসে বলে —
ইয়াবি: “আম্মা! তোমারে কতদিন পরে দেখলাম!… এই গেট খোল, চল ভিতরে যাই।”

এই কথা শুনেই দৌড়ে আসে হিয়া, নুসরাতের একমাত্র ছোট বোন —
হিয়া: “না না! দুলাভাই, গেট আগে খোলা যাবে না! কিছু শর্ত আছে।”

হিয়াকে দেখে মেয়েরা উচ্ছ্বাসে এগিয়ে আসে। হিয়াকে আর বাকি মেয়েদের আসতে দেখে বড়রা চলে যায় তারা জানে এখানে এবার কি হবে,,,
গেটের সামনে ফিতা টানানো, হিয়া দাঁড়িয়ে কনে পক্ষের হয়ে, মেয়েরাও একে একে হিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

লিজা: “আরে হিয়া দোস্ত! তোর সঙ্গে তো আমার দেখা হয়নি এখনো!”
হিয়া: “দেখা হইছে,এবার এদের কাছ থেকে টাকা চাবো,, এখন আগে টাকা দে! তারপর গেট খুলবো!”

আরোবি (হাসতে হাসতে): “এই দুলাভাই, আগে টাকা দেন, এরপর ঢুকেন।”

ইয়াবি হইচই করে: “এই এই! তোরা কিভাবে দল বদল করলি? এত অন্যায়!”

ইশান (অভিযোগের সুরে): “হায় হায়! মেয়েছেলেরা! তোরা আগে বর পক্ষ ছিলি, এখন কনে পক্ষ! আর তোরা দুলাভাইয়ের মানে নিজের ভাইয়ের কাছে টাকা চাইছিস! এও কী সম্ভব!”

সুরভী (চোখ টিপে): “কেন বলবো না! হ্যাঁ, আমরা ছিলাম বর পক্ষ… কিন্তু এখন থেকে কনে পক্ষ! রিহান যেমন আমাদের ভাই, তেমনি নুসরাতও আমাদের বোন।”

কাবির: “আহা! গাছেরও খাবি, তলারও কুরাবি! বাহ রে তোরা!”

ছেলে-মেয়েদের কথার লড়াই চলছে পুরো মজার ছলে। এতক্ষণ যারা বরপক্ষ ছিল, তারাই এখন কনে পক্ষের হয়ে যাচ্ছে—মাঠ একেবারে বদলে গেছে!

হিয়া (একটা গ্লাস তুলে রিহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে): “আচ্ছা দুলাভাই, এই নেন, এখান থেকে একটা শরবতের গ্লাস তুলুন দেখি!”

ইয়াবি (চোখ টিপে): “আমাদের কি গাধা পেয়েছিস নাকি? এরমধ্যে নিশ্চয় কিছু মিশায়েছিস! খাই না তোদের শরবত!”

রিহান (হাসি চেপে): “আচ্ছা খাচ্ছি… কত রঙের ডিভাইস দেখছি? আর সেখানে তো একটা শরবতের গ্লাস বের করাই তো মামুলি ব্যাপার!”

ইয়াবি: “Yes! এই না হলে বর! একদম বাঘ!”

রিহান একটা গ্লাস তোলে, খায়—কিছুই হয়নি।
ইশান (উঁচু গলায়): “এই হেরে গেল রে …”
জারা: “ হারবো আর আমরা তোর মতো মরা ডাক্তারের কাছে? হাহ!”

ইশান (আঁতকে): “তুমি আমায় এমন বলছ? বলো তুমি বলো, আমি শুনি!”

জারা রেগে তেড়ে গেলে, বাকিরা ধরে রাখে।
এই গেট যুদ্ধের মাঝেই এসে পৌঁছায় লিসি। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না চারপাশে এত হাসি, ঠাট্টা, টানাটানি দেখে।
আরোবি, তিশা, লিজা, জারা, সুরভী—সবাই এখন কনে পক্ষের দলে।
মেয়েরা (চিৎকার করে): “এই লিসি! আয়, আয়! এই গাদাদের পাশে দাঁড়াবি না! আমাদের দলে আয়!”

লিসি যেতে উদ্যত হতেই ছেলেরা হুংকার দেয় —
ছেলেরা: “এই তোরা সব এক জায়গায়! লিসি কিন্তু আমাদের দলে থাকবে!”

তখন মেয়েরা স্লোগান তোলে—

“আমরা সব কনে পক্ষেই থাকবো! ছেলেরা চিটিংবাজ! ওদের আজ ঠিক জায়গা বুঝিয়ে দিতে হবে!”

সবাই একসাথে হাত তুলে ঘোষণা দেয়—
“এই বিয়েতে আমরা মেয়ের দিকেই থাকবো! ছেলেরা আজ গেট পাবে না, পাবে শুধুই ঠ্যালা!”
এদিকে ছেলেরা তো মাথায় হাত!

কাবির, ইশান, ইয়াবি—সবাই গেটের ওপারে দাঁড়িয়ে একসাথে বলে ওঠে —
– "এইটা অন্যায়! বিয়েতে কেউ গেট পার্টি ছেলেদের বাদ দিয়ে করে নাকি!"

কাবির গলা চড়িয়ে বলে —
– "আর লিসি? সে তো আমাদের দলে! ও কিন্তু বরপক্ষের গেস্ট!"

মেয়েরা তখন ধপাস করে ঝাঁপিয়ে পড়ে লাফাতে লাফাতে —
– "নাহ!! লিসি এখন কনে পক্ষে! আমরা ওকে দলে নিয়ে ফেলেছি, পেটেন্ট করে ফেলেছি!"

এই কথা শুনে সবাই একসাথে লিসির দিকে তাকায়।
লিসি সামান্য থমকে গিয়ে দুইপাশে তাকায় — কোন দলে যাবে সে?
একদিকে মেহেদির দল, সাজসজ্জার সাথী, অন্যদিকে বরপক্ষের পুরাতন "ভাইয়া" সিন্ডিকেট!

রিহান জিভ কামড়ে বলে —
– "লিসি, এবার খোলাখুলি বলো তুমি কার দলে? পিঠে ছুরি মারো না কিন্তু!"

লিজা সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলতে তুলতে —
– "আমরাই তো ওর মেহেদি লাগিয়েছি, সাজিয়ে দিয়েছি, ঘোমটা ধরেছি, কাজেই লিসি এখন একেবারে কনে পক্ষে!"

এরপরই শুরু হয়ে যায় “লিসি টানাটানি”!
ছেলেরা এক হাত ধরে টানে, মেয়েরা আরেক হাত —
জারা চিৎকার করে বলে —
– "ওই থামো! শাড়ি ছিঁড়ে যাবে, মেকাপ উঠবে!"

ঠিক সেই মুহূর্তে —
ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে কিরিস।
চোখে স্নিগ্ধ অথচ চাপা একটা রাগ, গলায় নির্লিপ্ত ভঙ্গি, যেন ব্যাপারটা খুব সাধারণ —

সে সামনে এসে দাঁড়ায়, কারও দিকে না তাকিয়ে, কেবল লিসির দিকে একবার চোখ রেখে বলে —
– "এত টানাটানি কিসের? যা নিজের জায়গায় আছে, সেটা তো টানলে নড়বে না।"

মেয়েরা কিছুক্ষণ চুপ, তারপর চিৎকার —
– "ওইইই! দুলাভাইয়ের বড় ভাইয়ের লেভেলে এই কড়া ডায়লগ!"

কিরিস এক ধাপ এগিয়ে এসে লিসির পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হালকা হাত রাখে, যেন কিছুই না —
– "অন্য পক্ষের লোকদের নিয়ে ঝামেলা করলে, কিছু জিনিস গায়ে লেগে যায়। তাই সাবধানে থেকো সবাই।"
(তার গলা একেবারে ঠান্ডা, কিন্তু চোখে খেলা করে এক চাপা সতর্কবার্তা।)

লিসি একটু চুপ করে থাকে, কিছু না বলে চোখ নামিয়ে ফেলে।
কোনো কিছু না বলেই বুঝিয়ে দেয়... ওর অবস্থান ঠিক কোথায়।
মেয়েরা হইচই করে —
– "আহা রে! কথার মারপ্যাঁচে দুলাভাইয়ের বড় ভাই এক্কেবারে হিরো!"
আরোবি বলে —
– "এই যে লিসি, তুই মিষ্টি মেয়ে বলেই কিছু বলিস না, না হলে তো পজিশন চেঞ্জ হয়ে যেত!"

তিশা ডায়লগ মারার ভঙ্গিতে বলে —
– "আজ বুঝলাম, প্রেম যদি হয়ও, সেটা নিঃশব্দেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর !"

ইয়াবি হাসতে হাসতে বলে —
– "এইটা কী ছিল? চুপচাপ হজম করে ফেললাম!"

এদিকে আবার শুরু হয় "গেট আটকাও টাকা আদায়" পার্ট।
আরোবি দুই হাত বুকের সামনে বাঁধা, গম্ভীর হয়ে দাঁড়ায় —
– "দুলাভাই রাজা হোন বা হিরো, গেট খুলতে হলে টোল দিতে হবেই!"

সুরভী বলে —
– "এই বিয়েতে শালিরা ফ্রি-তে হাঁপা দেবে না!"

তিশা হেসে বলে —
– "আমরা তো আগে থেকেই লিস্ট করেছি! রেডি ক্যাশ না হলে গেট খুলবো না!"
বরপক্ষে ইশান, কাবির, রিহান আর ইয়াবি দাঁড়িয়ে রীতিমতো গেম প্ল্যান করছে —
"চলো বামে ডাইভারশন দেই, কাবির ডান দিক থেকে পালায়!"

ঠিক তখন কিরিস আবার সামনে আসে, একটু বিরক্ত মুখ করে বলে —
– "কে কে টাকা চায়? হিসেব করে বলো, একবারেই দিয়ে দেই। বারবার ঝামেলা পছন্দ না।"

মেয়েরা হেসে চিৎকার —
– "তোমাকেই তো খুঁজছিলাম ভাইয়া!"
– "বিয়ে মানেই খরচ, আর আমরা খরচ তুলতেই এসেছি!"

কিরিস তখন পকেট থেকে একটা চেকবুক বের করে বলে —
– "ক্যাশ কম, চেক চলবে?"
সাথে সাথে আবার নতুন হাসির ঝড়!

মেয়েরা বলে —
– "এমন হ্যান্ডসাম কেউ চেক দিলে সেটাও যেন গোল্ড প্লেটেড লাগে!"

সবাই হেসে উঠলে লিসি একপাশে দাঁড়িয়ে হালকা একটু হাসে, কিছু বলে না।
কিরিস ঠাণ্ডা গলায় বলে —
– "তোমরা তো একেকজন সিআইডির মতো টাকা চাইছো, যেন আমি কোনো ক্রাইম করে ফেলেছি!"

মেয়েরা হো হো করে হাসতে থাকে।
আরোবি বলে —
– তোমার চেহারাটাই এমন ভাইয়া, যে দেখে পুলিশও ভাবে, 'এ তো কিছু না কিছু করেইছে!'"
এটা শুনে কিরিস সহ বাকি ছেলেরা একটা রহস্যময় মুচকি হাসি দেয় যেটা তাদের পাঁচ জনের ভিতরে সীমাবদ্ধ

কাবির নাটকীয় গলায় বলে —
– "এই যে হিয়া, তোরা ৫০ হাজার চাইছিস? একটু কমাও তো! আমরা তো গরিব মানুষ!"

হিয়া ভ্রু তুলে হেসে বলে —
– "গরিব? BMW আর ল্যাম্বরগিনি নিয়ে বিয়ে করতে এসেছো আর এখন গরিব? এই লাইন দিয়ে মুভি হবে কাবির ভাই!"

ইশান কথা ঘোরানোর জন্য একচোখে চোখ টিপে বলে —
– "এই যে লিসি, তুমি একবার বলে দাও তো তুমি কোন দলে? আমরা না ওরা?"

এই কথা শুনে আবার মেয়েরা আর ছেলেরা একসাথে টানাটানিতে জড়িয়ে পড়ে!

"লিসি আমাদের দলে!"
"না! লিসি বরপক্ষেই থাকবে!"
লিসি মনে মনে—
"আরে ভাই, আমাকে ছাড়া কি এই দুনিয়ায় আর কেউ নাই নাকি! এরকম সিচুয়েশনে সবসময় আমাকে নিয়ে টানাটানি করতে হবে ? কেউ তো আমাকে বলার সুযোগও দিচ্ছে না…,একবার নানুকে পাই আমি নানুকে ছেড়ে আর কোথাও যাবো না !"

ঠিক তখনই,
কিরিস ধীর পায়ে এক ধাপ এগিয়ে এসে নাটকীয়ভাবে লিসিকে এক ঝটকায় নিজের পাশে টেনে আনে।
হালকা কোমরে হাত দিয়ে বলে —

– "শেষ কথা—ও বরপক্ষেই। কে কী বললো সেটা আমার জানার দরকার নেই।"

মেয়েরা একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে —
– "এই এই! এমন জোর করে কেউ কাউকে দলে নেয়? এটা তো বলপ্রয়োগ!"

সুরভী মুখ শক্ত করে বলে —
– "টাকা না দিলে গেট খুলবো না, দুলাভাই যতই সুপার হিরো হন!"
তিশা গলা নামিয়ে নাটক করে —
– "চা না খেলেও চলবে, কিন্তু ৫০ হাজার না দিলে আজকের বিয়ের সূর্যই উঠবে না!"

কিরিস ধীরে পকেটে হাত দেয়।
চোখ নামিয়ে মেয়েদের দিকে একবার তাকিয়ে নেয়।
তারপর মাথার দিকে হাত তুলে একদম নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলে —
– "আরে মাথা খারাপ হয়ে গেলো... আমি তো ভেবেছিলাম তোমরা অন্তত ৫০ লাখ চাইবে..."
এক সেকেন্ড নিঃস্তব্ধতা।তারপর—
– "কি… কী বললে?!" — মেয়েরা প্রায় একসাথে চেঁচিয়ে ওঠে!”
আরোবি চোখ বড় করে বলে —
– "তুমি ভেবেছিলে আমরা ৫০ লাখ চাইবো?! কী ধারনা তোমার আমাদের সম্পর্কে ভাইয়া!"
হিয়া হাসি চাপতে না পেরে বলে —
– "এখন থেকে গেট পার্টির নামে একটা রেজিস্ট্রেশন খুলে ফেলি, 'দুলাভাই ট্যাক্স সংস্থা'!"
তিশা আবার বলে —
– "আসলে আসল মজা তো গেট পার্টিতে, বিয়ে তো শুধু অজুহাত!"
সুরভী হাত কোমড়ে দিয়ে —
– "এই ভাইয়া কোটি টাকার লোক বুঝি! প্ল্যান করে এসেছে যেন দশটা গেট পার্টিও সামলাতে পারে!"

হিয়া হেসে বলে —
– "উফফ! কেউ ৫০ হাজার চাইলে এভাবে কোটির স্বপ্ন দেখে নাকি!"
তিশা হেসে বলে —
– "যেই ভঙ্গিতে ভাইয়া লিসিকে পাশে টানলো, মনে হলো শত্রুর কবল থেকে দেশের মানচিত্র উদ্ধার করছে!"

হিয়া সঙ্গে সঙ্গে যোগ করে —
– "হ্যাঁ, আর আমরা সেই মানচিত্রের কাস্টম অফিসার — ফি না দিলে পার হবে না!"
সবাই একসাথে হেসে গড়াগড়ি খায়।
ইশান ফিসফিস করে বলে —
– "ভাইটা লেভেলেই আলাদা... কথা কম, দাম বেশি!"

কিরিস কিছু না বলে হালকা এক কোণঠাসা হাসি দেয়।
লিসির দিকে একবার তাকায় — চোখে যেন ঠাণ্ডা অভয়।
এই এতো টানাটানির মধ্যে রিহান ছিল একেবারে বরের মতো চুপচাপ। মুখে একটাও কথা নেই—সে তো আজ বর, তেমনিই গম্ভীর, কম কথা বলাই মানায় তাকে।

এই সময় কিরিস সামনে এগিয়ে এসে চেকবুক খুলে ৫০ হাজার টাকা লিখে সাইন করে মেয়েদের হাতে তুলে দেয়। টাকা পেয়েই মেয়েদের তো যেন মহালাভ! মুহূর্তেই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে তারা—

— “ইয়েস!! টাকা পাওয়া গেছে!! এখন ফুল ছিটাও!”

কিরিস তখন রিহানের দিকে তাকিয়ে এক গম্ভীর ভঙ্গিতে বলে — — “এটা তোর দেওয়ার লাগবে না। আমার পক্ষ থেকে গিফট।”

রিহানও এবার হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে — — “তুই না বললেও আমি দিতাম না।”

এই কথার পর একসাথে সবাই হেসে ওঠে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লিসি তখনও চুপচাপ, ঠোঁটে এক রহস্যময় হাসি, চোখে প্রশ্রয়ের মায়া… যেন এই ছেলেমানুষি সব ওর অজান্তে নয়।

এরপর বরপক্ষের সকলে একসাথে ভিতরে ঢুকতে শুরু করে। কনে পক্ষের মেয়েরা তাদের উপর ঝরাতে থাকে ফুলবৃষ্টি— চারপাশে যেন এক রঙিন স্বপ্নের রাজ্য, পুষ্পঘ্রাণে ভরে যায় পুরো ভেন্যু। ছেলেমেয়েরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ফুল ছিটাচ্ছে একে অপরের উপর, কেউ হেসে, কেউ চমকে, কেউ আবার মুখে রং তুলছে কৌশলে।
ছেলেরা তখন মজা করে বলে — — “তোরা তো দেখি ভয়ঙ্কর স্বার্থপর! টাকা ছাড়া তো কিছুই বোঝিস না!”

মেয়েরা আবার হেসে পাল্টা দেয় — — “তোরা তখন ছিলি আমাদের বিপক্ষে! এখন বলিস বরপক্ষ!”

ইয়াবি মুখ কুঁচকে বলে — — “মানে কি? এখন তোরা বরপক্ষ?”

সুরভী চোখ টিপে বলে — — “অবশ্যই!”

কাবির হেসে বলে — — “আহ! নিজেদের মধ্যে বিয়ে করলে এমনটাই হয়!”

এই কথাতেই পুরো গ্রুপ একসাথে হেসে ওঠে। হাসি-মজা, ঠাট্টা-মশকরা, আর স্মৃতির মোড়কে সবাই মিলে ঢুকে পড়ে ভিতরে।

রিহান যখন ভেন্যুর মধ্যে ঢোকে, ঠিক তখনই পাশ থেকে মাইকে বাজতে থাকে সেই বিখ্যাত গানটা— 🎵 “জামাই সেজে আমি হাজির হয়েছি, উপহার কি কি পাবো লিস্টি করেছি!” 🎵

বরযাত্রীর লোকজন তখন নাচতে নাচতে ঢুকছে, আর আশপাশের অতিথিরা হাসিমুখে বলে উঠছে — — “এই তো বর চলে এসেছে!” — “দেখো বর ঢুকলো!”
এই খবর পৌঁছতে দেরি হয় না নুসরাতের কানে। সে তখনো সাজগোজে ব্যস্ত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কানে এই শব্দ শুনে তার ঠোঁটে এক শান্ত, লাজুক হাসি। চোখে মেঘলা আলো—শুরু হতে যাচ্ছে তার জীবনের নতুন অধ্যায়।

ভেতরে তখন সবাই নিজেদের মতো ছড়িয়ে গেছে। ছেলেরা গল্পে ব্যস্ত, মেয়েরা কেউ ভিতরে ঘুরছে, কেউ নুসরাতের পাশে, কেউ লিসির খোঁজে।

লিসি তখন তার নানুকে খুঁজছে ঘুরে ঘুরে। আর ভেন্যুর এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে কিরিস আর ইয়াবি।

ইয়াবি মুখ কাঁচুমাচু করে বলে — — “Bro! তুই মানুষকে কথার জালে বেশ ফাঁসাতে পারিস! ভাবিকে কিভাবে আমাদের দলে টেনে ফেললি বল তো!”

কিরিস এক চোখ ছোট করে ঠাণ্ডা গলায় বলে — — “ভাবি কে?”

ইয়াবি হেসে ওঠে — — “Oh come on bro! Obviously লিসি!”

ঠিক তখন কাবির ডেকে ওঠে — — “এই ইয়াবি! এখানে আয়!”

ইয়াবি হেসে বলে — — “আসি রে, দাঁড়া একটু!”

তারপর সে কাবিরের কাছে গিয়ে তার বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেয়, আর ভেন্যুর রঙিন আলোয়, গানের ছন্দে ভেসে যেতে থাকে বিয়ের সন্ধ্যা।
মঞ্চের ওপর বসে আছে রিহান। আজকের বর, আজকের কেন্দ্রবিন্দু।
হালকা মুচকি হাসি ঠোঁটে, পরনে সোনালি বর্ডারের সাদা সিল্ক পাঞ্জাবি, উপরে রঙিন জ্যাকেটের বুকপকেটে সাদা গোলাপ গুঁজে রাখা। পাশে রাখা এক গ্লাস পানি।
স্টেজ জুড়ে সোনালী আলো ছড়িয়ে, ফুলে সাজানো পেছনের ব্যাকড্রপে আলো এসে পড়লে মনে হয় যেনো একটা রাজকীয় ছবি।

এদিকে কিরিস মঞ্চ থেকে খানিকটা দূরে, বাবার পরিচিত বড়দের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ে ব্যস্ত— — “আরে কিরিস! কতদিন পর!”
— “আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগলো দোয়া রাখবেন।”

তারপর সামান্য ঝুঁকে, এক পাশ ঘেঁষে ফিসফিসিয়ে বলে — — “যদিও আমি দোয়ার বিশ্বাস করি না।”

মুচকি হেসে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয় অন্যদিকে।
তবে তার চোখ দুটো কিন্তু এক ঝলকেই পুরো ভেন্যু স্ক্যান করে ফেলেছে— কে কোথায় দাঁড়িয়ে, কার মুখে কী, কে কার সঙ্গে কথা বলছে... কিছুই তার নজর এড়ায় না।
এদিকে লিসি অবশেষে খুঁজে পায় তার প্রিয় নানুকে।
মির্জা বেগম তখন ভিতরে দাঁড়িয়ে গল্পে মগ্ন, পাশে তার মেয়ে সাবেনা, বউমা সুপ্রিয়া—একসাথে আড্ডায়।

লিসি ছুটে গিয়ে বলে — — “নানু! জানো তুমি কোথায় কোথায় না আমি খুঁজেছি!”

পাশ থেকে হেসে উঠে বলে এক নারী — — “ওই তো তাহলে এই লিসি! আর ছোট বোনের একমাত্র মিষ্টি মেয়ে... এদিকে আয় মা, আমি তোর মেজো খালা।”

কিরিস এক ঝলক মির্জা বেগমের দিকে তাকায়। তিনি চোখের ইশারায় তাকে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দেন।

সাবেনা আদরের গলায় বলে — — “বাবা! কত বড় হয়ে গেছে...! এখন বিয়ে দিলে তো... বাচ্চাগাছ্চা হয়ে যাবে!”

লিসি মুখ বাঁকিয়ে বলে — — “নানু, আমি তোমার সাথে কথা বলবো।”

মির্জা বেগম হেসে মাথা নাড়ে — — “হুম, কি কথা? শুনি দেখি।”

লিসি এবার একদম নাতনির মতো গলা ছেড়ে বলে — — “আহ! নানু তুমি জানো না আমাকে একটু আগে সবাই টানাটানি করে দুই ভাগ করে ফেলছিলো... একটুও বলতে দেয় না কিছু!”
মির্জা বেগম হেসে বলে — — “কি করবি বল! তুই তো ওদের একমাত্র ছোট বোন—এই ধকল তো তোর উপরেই যাবে!”

লিসি মুখ ফুলিয়ে বলে — — “কিন্তু নানু...”

সুপ্রিয়া তখন হাত ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করে — — “আচ্ছা হয়েছে, তোর কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”

লিসি মাথা নাড়ে — — “না…”

সুপ্রিয়া হেসে বলে — — “যাক বাবা, তাইলে ঠিকই আছিস।”

সাবেনা এবার খিলখিলিয়ে হেসে বলে — — “তুই একদম আমেনার মতো! কিছু হলেই মাকে বলতিস, আর এখন নানুকে...”

— “ওভাবে তাকাস না! আমি তোর বড় খালা! আর সেজো খালা আছে ভিতরে ঘরে।”

লিসি কুণ্ঠিত গলায় বলে — — “খালামণি তো তোমাদের দেখেনি আমি…”

কাবেনা এগিয়ে এসে আদরে মাথায় হাত রেখে বলে — — “হুম, একদম মন খারাপ করবি না। তোর এক মা নেই তো কী হয়েছে? আমরা তো আছি তিনজন মা আছি! তাই না সাবেনা? তুই এসেছিস শুনে মাবেনা বিশাল খুশি হবে!”
এই বলে দুই খালা একসাথে লিসিকে জড়িয়ে ধরে।
লিসির বুকের ভেতর যে শূন্যতা ছিল, সেটা যেন এক ঝলকে পূর্ণ হয়ে গেলো। চোখে জল গড়াতে চায়, কিন্তু ঠোঁটে হালকা এক তৃপ্তির হাসি।

সুপ্রিয়া এগিয়ে এসে মজা করে টেনে নিয়ে বলে — — “বললেই হলো! তোমরা একা লিসির মা! আমি কি উড়ে এসেছি নাকি?”

সাবেনা হেসে বলে — — “তা কেন হবে ভাবি! কিন্তু লিসি তো আমাদের মেয়ে, কারণ আমাদের দল ভারি!”

সুপ্রিয়া মুচকি হেসে বলে — — “আহ! যদি প্রিয়া থাকতো, সেও এক কথা বলতো…”

এই কথার পর আবার এক দফা টানাটানি শুরু হয়—
লিসি কার মেয়ে? খালার নাকি মামার?

মির্জা বেগম কিছুটা দূর থেকে দাঁড়িয়ে চুপচাপ এই দৃশ্যটা দেখেন।
হৃদয়ের গভীর থেকে শুধু একটাই কথা মনে পড়ে যায়— — “জিহাদ, দেখো! আমি তোমার মেয়েদের খারাপ শিক্ষা দিইনি। আর বউমারা? তারাও তো আমাদের মেয়ে... তাই না?”

স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি নিজের সন্তানদের বড় করেছেন মমতা দিয়ে, ভালোবাসায় গড়া এক সচ্ছল, সুখী পরিবারে।
আজ তার চোখের সামনে সেই মধুর দৃশ্যের পূর্ণ প্রকাশ।
অন্যদিকে জারা মেয়েদের দলে দাঁড়িয়ে মজা করে বলে — — “লিসি তো দেখছি শাড়ি, কাপড়, নাচ সব ছেড়ে টানাটানির জালে পড়ে বাড়ি যাচ্ছে আজ শুধু !”
হাসির রোল পড়ে পুরো ঘরে।

এই মুহূর্তে সত্যি মনে হচ্ছে—
একটা পরিবারের সুখী গল্প যেন খুঁটিনাটি আনন্দের ভেতর দিয়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

লিসির কাছে যেন এই টানাটানিটা বেশ ভালোই লাগছিল আজ। কে কার মেয়ে, কে বেশি ভালোবাসে—এই নিয়ে সারাক্ষণ টানাটানি, আদরের খেলা।
হঠাৎ সুপ্রিয়া লিসির হাত ধরে টেনে বলে — — “আমার অধিকার বেশি! মামি থেকে ‘মি’ বাদ দাও, দেখো ‘মা’ থাকে!”

সঙ্গে সঙ্গে সাবেনা খেপে গিয়ে বলে — — “আহ! না রে, বোনের মেয়েও আমার! মানে সে তো আমাদের মেয়ে!”

এই টানাটানির মাঝে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াবির চোখে পড়ে গোটা দৃশ্যটা।
সে তখন কাবিরদের সাথে গল্প করছিল, হঠাৎ তাকিয়ে দেখে কিরিস দাঁড়িয়ে ফোন ঘাটছে, আর ওদিকে লিসিকে নিয়ে চলছে টানাটানি কাণ্ড।
আর দেরি না করে, সে এগিয়ে যায় সোজা মায়েদের দিকে।

ঠিক তখনই লিসি মির্জা বেগমের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলে — — “যে টানাটানির জন্য তোমার কাছে আসলাম, এখানে এসে দেখি আরো টানাটানি! আহ, হয়েছে এবার ছাড়ো আমাকে...!”

তার কথা শেষ না হতেই ইয়াবি সামনে চলে আসে, একটানে লিসির ডান হাত ধরে বলে — — “আরেহ! আমার ভাবিকে ছাড়ো! ভাইয়া চাইছে!”
এই কথাটা শুনে পাশের সব মায়েরা থমকে যায়।
— “কি বললো? কে ভাবি? ভাইয়া মানে কি?”
সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকায়—ধীরে ধীরে আলো জমে উঠছে মনে, মুখে কিন্তু কৌতূহল!

ইয়াবি ততক্ষণে লিসিকে টেনে নিয়ে গেছে, সরাসরি নিরিবিলি কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কিরিসের কাছে।
লিসি কিছুই বুঝতে পারছে না—‘ভাবি’? ‘ভাইয়া’? কি বলছে?

যে মুহূর্তে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ইয়াবি এক ঝটকায় লিসিকে কিরিসের দিকে ঠেলে দেয়।
ধপাস করে গিয়ে পড়ে কিরিসের বুকে!

কিরিস শক্ত হাতে ধরে ফেলে, এক মুহূর্ত। নিঃশব্দ। ধাক্কা, স্তব্ধতা, আর চোখে চোখ।
তারপর ভুরু কুঁচকে ইয়াবির দিকে তাকিয়ে বলে — — “এটা কি, হ্যাঁ?”

ইয়াবি হেসে হেসে বলে — — “ধরে রাখ! না হলে সবাই মিলে টানাটানি করে ছিঁড়ে ফেলবে! আমি গেলাম ব্রো—এনজয়!”

এমন উল্টাপাল্টা অবস্থায় লিসি নিজের সামলে নিলেও, মুখ তো লাল হয়ে উঠেছে!
চোখ তুলে তাকাতেই দেখে সে এখনও কিরিসের বুকে! সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়।
— “কি বললো ইয়াবি ভাইয়া? এসব তার মানে আপনি বলছেন তাই না? দুষ্টু লোক!”

বলে চলে যেতে যাবে, হঠাৎ কিরিস পিছন থেকে তার শাড়ির আঁচল ধরে টান দেয়—

— “ঘড়ি দাও, আমি পরবো!”

লিসি পিছন ফিরে চোখ কুঁচকে বলে — — “আগে আঁচল ছাড়েন, তারপর আনছি।”

তারপর সোজা চলে যায় মির্জা বেগমের কাছে, ব্যাগ থেকে ঘড়িটা বের করে আবার ফিরে আসে কিরিসের কাছে।
ঘড়িটা হাতে দিয়ে বলে — — “এই নেন আপনার ঘড়ি।”

কিরিস ঠাণ্ডা গলায় বলে — — “পরিয়ে দাও।”

লিসি বিরক্ত গলায় বলে — — “আল্লাহ! আপনার তো হাত আছে! নিজেই পড়েন!”

কিরিস চোখ সরু করে বলে — — “মাকে ডেকে বলবো কিন্তু… আমি সেই ভাই।”

লিসি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে — — “বিজনেসম্যান না হয়ে পুলিশ গোয়েন্দা হওয়া উচিত ছিল আপনার! মানুষ তো আপনাকে দেখেই সব সত্যি বলে দিত!”
এই বলে ধীরে ধীরে কিরিসের হাতে ঘড়ি পরিয়ে দেয়।
কিরিস তার দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে… সেই তাকানোতে না রাগ, না প্রেম—কোনো এক অদ্ভুত নিরব দাবি।

ঘড়ি পরিয়ে দিয়ে লিসি চলে যায়, আর পেছনে দাঁড়িয়ে কিরিস তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দেয়।

সবার হাসি, মজা, ঠাট্টা–তামাশার মাঝেই ধীরে ধীরে বিয়ের আসল মুহূর্ত শুরু হয়।

চারপাশ সাজানো যেন কোনো রাজকুমারীর রাজপ্রাসাদ।
সোনালী পর্দা, আকাশী–সাদা ঝুমঝুম রঙে রাঙানো চারপাশ, মাথার ওপর চিকচিকে ঝাড়বাতি আর তার নিচে হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে...
মঞ্চের মাঝখান দিয়ে ঝিমঝিম করে ছুটে আসছে আলোকরেখা… আর ঠিক তখনই বাজে—

🎶 "Mere ghar aaya tu aaya mujhko lene
Dil ke badle mein dil ka nazraana dene…
Saajanji ghar aaye,
Dulhan kyun sharmaaye…"

সেই সুরের তালে ধীরে ধীরে সামনে আসে নুসরাত।

তার গায়ে আকাশী রঙের নরম কাজ করা বিয়ের জামা, মাথায় সূক্ষ্ম ঝালর দেওয়া ঘোমটা—
চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লাল টোন, গলায় হীরার নেকলেস, হাতে মেহেদি আঁকা রঙিন ছোঁয়া।

সে যেন এক রূপকথার বউ।
চোখে একসাথে লজ্জা, ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের ঝলক।
তার আগমনে যেন পুরো সময় থেমে গেছে।

নুসরাতকে আসতে দেখে আশপাশের সবাই নিজেদের কাজ থামিয়ে স্টেজের সামনে এসে দাঁড়ায়।
সবার চোখে শুধু এক দৃশ্য—
নুসরাত আর রিহান।

মেয়েরা আশপাশ থেকে ধীরে ধীরে তার পেছনে এসে দাঁড়ায়—
সবার হাতে ফুল, কনফেটি, কারও হাতে ধুনুচি জ্বলছে।
সবাই নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে—একটি নিঃশ্বাসও যেন থমকে আছে।

ক্যামেরাম্যান প্যান করে একের পর এক এক্সপ্রেশন ধরছে—
একেকটা যেন পেইন্টিং হয়ে উঠছে।

এদিকে রিহান উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখ যেন আটকে গেছে এক বিন্দুতে—
শুধু নুসরাত!

তার সামনে আসতেই চারপাশের সবাই একে একে দাঁড়িয়ে পড়ে, ফিসফিস করে বলে উঠে— – “এই তো… আমাদের নুসরাত…”

স্টেজে ওঠার মুহূর্তে, রিহান এক হাতে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
নুসরাত একটু থেমে হালকা হাসে, তারপর হালকা কাঁপতে কাঁপতে সেই হাতটা ধরে মঞ্চে ওঠে।

এটা ছিল প্রথমবার…
সবাই দেখে তাদের এত বছরের ভালোবাসা আজ সত্যি হলো।

রিহানের চোখে জল…
সে কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারে না।
সে কাঁদে—আনন্দে, ভালোবাসায়, পরিপূর্ণ তৃপ্তিতে।

রিহানকে কান্না করতে দেখে সবাই একটা গভীর তৃপ্তির হাসি দেয়…

নুসরাত ধীরে ওর পাশে দাঁড়িয়ে, হালকা জড়িয়ে ধরে বলে—
"কান্না করছো না... আমি তো আছি, না? চুপ করো..."

নিচে থাকা বড়রা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে—
আনোয়ার:
– "তাহলে অবশেষে ওরা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে, তাই না আনারুল?"

আনারুল:
– "হুম ভাইজান, মন ভরে দোয়া করি যেন ওরা সারাজীবন একসঙ্গে থাকে… সুখে থাকে।"

চারপাশে সবাই নিঃশব্দে দোয়া করে—মন থেকে।

এদিকে পেছনে—

তিশা, কাবিরের হাত শক্ত করে ধরে বলে—
"দেখবে, আমরাও একদিন এভাবে বিয়ে করবো…"
তারপর মজার ছলে যোগ করে,
"…কিন্তু শর্ত—রিহানের মতো কান্না না করলে বিয়ে করবো না তোমায়!"

কাবির হেসে:
– "আরে রিহান কি কান্না করতে পারে! আগে আমার বিয়ে হতে দাও—দেখাবে কিভাবে কাঁদতে হয়!"

এই শুনে ইশান, পাশে বসা জারাকে বলে—
"তুমি চাইলেও আমি কান্না করতে পারি…"
জারা চোখ টিপে উত্তর দেয়,
"বাচ্চা নাকি যে কান্না করবি!"

এইসব শুনে মাঝখানে বসা সুরভী মাথায় হাত দিয়ে বলে—
"এই আরে! আরোবি আমায় এখান থেকে বের কর! এই কাপলদের মধ্যে পড়ে গেছি!"

সুরভীর কথা শুনে লিসি আর আরোবি না হেসে পারে না—
ওরা দুজন হেসে কুঁচকে যায়।

পাশেই লিজা আর হিয়া নিজেদের গল্পে ব্যস্ত, কারো কিছুতেই কিছু যায় আসে না…

ঠিক তখন, কাজি সাহেব চলে আসেন মঞ্চে।
তার হাতে কাবিননামা, পাশে দাঁড়িয়ে যান পরিবারের বড়রা।

কাজি সাহেব “বিসমিল্লাহ…” বলে বিয়ে শুরু করেন।

তিনবার প্রশ্ন আসে:

 “নুসরাত … আপনি কি কবুল করছেন?”
 “…কবুল…”

 “রিহান রায় চৌধুরী … আপনি কি কবুল করছেন?”
 “…কবুল…”

 “আবার কবুল?”
 “…কবুল আলহামদুলিল্লাহ।”
চারদিক থেকে উঠে আসে করতালি, কেউ বলে—
"মাশাআল্লাহ…"
"আলহামদুলিল্লাহ…"
"সালামত থাকো, সুখে থেকো…"