উপন্যাস : তোমাকে চাই
লিসি একটু লাজুকভাবে বলে —
"চেষ্টা করতে পারি…"
গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে,, লিসির গানের লাইন ধরার আগে কোথা থেকে রিহান হাতে করে গিটার নিয়ে আসে,,এনে বলে —" বোন আমি আছি তুই গা,,। আমি বাজাচ্ছি গিটার, হয়তো ভালো পারি না,। তবুও চেষ্টা করছি শুধুমাত্র তোর জন্য "
লিসি মুচকি হাসে,,
সুরভী —"হ্যাঁ তোরও কিছু করা উচিত। বর বলে কথা, আর রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে গিটার!! তারপরেও বাজা, আমরা শুনছি তাই না আরোবি ,, "
আরোবি —" হুম হুম,,,,, নে এবার গা "
রিহান গিটারের তার ঠিক করে নিতে থাকে আর লিসি বসে মুখে মিষ্টি একটা হাসি,, গান গাওয়ার আগে তার চোখ যায় কিরিসে দিকে একটু দুরে ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাগানের দিকে মুখ করে,,চাঁদের আলোয় জল জল করছে মুখখানি,,, চাঁদের আলোয় যেন কিরিসে সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে,,,, লিসি কিরিসের মুখ পানে একটুখানি চেয়ে,, চোখ নামিয়ে গাইতে
শুরু করে —
"মায়াবন বিহারীনি হরিনী,
গহন-স্বপন-সঞ্চারিনী (ll)
কেন তারে ধরিবারে করি পণ অকারণ
"মায়াবন বিহারীনি "
থাক থাক নিজমনে দূরেতে,
আমি শুধু বাঁশরীর সুরেতে(ll)
পরশ করিব ওর প্রাণমন
অকারণ।
"মায়াবন বিহারীনি "
চারদিক চুপ… শুধু সেই কণ্ঠ। সবাই চুপ করে লিসির গান শুনছে,, চারিদিকে কোন শব্দ নেই শুধু তার আওয়াজ আর রেহানের গিটারের শব্দ,,
কিরিস দুরে বসে চুপ করে শুনছে… চোখ নামিয়ে।
আর লিসি পরের লাইন ধরার আগে কিরিসের দিকে তাকিয়ে থাকে আর গলায় তখন উঠে আসে একটাই উত্তর —
"দূর হতে আমি তারে সাদিব
গোপনে বিরহ ডোরে বাঁধিবো …"(ll)
বাঁধন বিহীন সেই
যে বাঁধন অকারণ
"মায়াবন বিহারীনি "
লিসি এই সুর শুনে চোখ তুলে তাকায় কিরিস, কি এক অদ্ভুত অনুভূতি, যেন এই গানের লাইন গুলো লিসি কিরিসের জন্য উৎসর্গ করছে,,,
একটু আগেই যার জন্য তার চোখে পানি ছিল, এখন তার জন্য তার গলায় সুর,,
গান শেষে মুহূর্তের নীরবতা। তারপর একসাথে সবাই হাততালি দেয়—
সুরভী (মুগ্ধ হয়ে): “তুই তো মন ছুঁয়ে দিলি রে!”
আরবি: “লিসি, তোর গলায় একরকম শান্তি আছে…”
লিজা: “মনেই হয়নি এত আবেগ নিয়ে গান গাওয়া যায়!”
কাবির (হাসতে হাসতে): “রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে, তোকে ওনার পার্মানেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে নিতেন আর তোকে নিয়েই লিখতেন "এক রুপসীর সুরের জাদু" !”
ঈশান: “সত্যি বলি, আমাদের মধ্যে সবচেয়ে আলাদা তুই।”
রিহান: “ভাইরে, এখন থেকে লিসি ছাড়া আমাদের কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান চলবে না।”
ইয়াবি: “তুই গান গাস আর আমি চোখ বন্ধ করি— ব্যস, স্বর্গ!”
প্রশংসা পেয়ে তো বেশ খুশি লিসি,,মুখে মিষ্টি এক হাসি তার, আর চারপাশে সবার আনন্দ উল্লাস,,,,
একটু দূরে, ছাদঘেঁষা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিরিস এক চিলতে হাসি দেয়। প্রশংসার বন্যা শুনে তার চোখে একটা স্নিগ্ধ ভালোবাসার দীপ্তি খেলে যায়। ওর লিসি। সবাই যাকে এখন চিনছে, সে কিরিসের হৃদয়ের রানী।
কিরিস এবার ছাদ থেকে নেমে বাবা চাশার কাছে যায়,,,। কালকের বিয়ে— কোনো ঝামেলা সে রাখবে না।
সব কিছু আগেভাগেই ফাইনাল করতে চায়।
কিরিস: “বাবা, কালকে তো মানুষজন যাবে অনেক। গাড়ি কয়টা রেডি করবো। আমি ফেলে রাখতে চাই না।”
আনোয়ার: “কতটা নিয়ে যাবি? যতজন মানুষ যাবে সেই অনুযায়ী দেখতে হবে ?”
আনারুল —" এখন আমার মতে আর হিসাব অনুযায়ী মোট ৫০০ জন তো হবে,, "
আনোয়ার —" হুম তাতো তাহলে সেই হিসাব করে গাড়ি নেবো "
কিরিস: “তাহলে, ৩-৪ হাজার গাড়ি ঠিক করছি"
কিরিসের এই কথায় আনারুল আর আনোয়ার দুজনেই অবাকের শেষ সীমানায় পৌছে গেছে,,
আনোয়ার চমকে উঠে বলে —
“তিন-চার হাজার! তুই গাড়ি নিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছিস, না গ্যাং চালাতে?”
আনারুলও থামতে পারেন না —
"তুই কি রাজনীতি শুরু করলি? যে পুরো মিছিল নিয়ে বিয়ে করবি?”
কিরিস (গম্ভীর গলায়): “কেন? যা লাগবে, তাই তো নেবো। আর গাড়ির কি অভাব আছে,,,যদি চাও তাহলে আমি পুরো বাংলাদেশের গাড়িও নিয়ে যেতে পারি,, ?”
আনোয়ার: “তোর মাথায় ঠিক আছে তো? এত গাড়ি কি করবি?”
কিরিস: “আচ্ছা ফোন দাও ফুফুকে, কয়টা গাড়ি রাখার জায়গা আছে শুনে নেই,, তারপর দেখি,"
(ফোন দেয় ফুফুকে)
“হ্যালো ফুফু, তিন-চার হাজার গাড়ি রাখতে পারবে তোমাদের কমিউনিটি সেন্টারে?”
ফুফু তো হতবাক। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বোন-আত্মীয়রা সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মাবেনার দিকে ।
মাবেনা : “তিন-চার হাজার গাড়ি! কী বলছিস রে! বিয়ে নাকি ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে?”
কিরিস: “বুঝলাম না। জায়গা কতটুকু বলো আগে।”
মাবেনা: “তোর জামাইবাবুর কাছে শুনেছিলাম,,এই ধরো ৫০০ গাড়ির জায়গা আছে। তার বেশি হলে বাইরে রাখতে হবে।”
আনারুল কিরিসের কাছ থেকে ফোন নিয়ে বলে —" হুম মাবেনা বুঝেছি, এখন রাখছি, "
আনোয়ার: “তুই থাক। তোর মাথায় যা আসতেছে তাতে মনে হইতেছে তুই পুরো বাংলাদেশকে নিয়ে বিয়ে করতে যাবি !”
কিরিস : "তাহলে কি করবো "
আনোয়ার —" তোকে কিছু করতে হবে না,,, আচ্ছা সব কি গোছানো শেষ শুধু এই গাড়ি বাকি আছে "
কিরিস —" হুম আর বাদবাকি সব আমি ঠিক করে রেখেছি,, আমার জানা ছিল না যে কতজন যাবে সেটাই জানতে চেয়েছিলাম আর সে অনুযায়ী গাড়ি প্রস্তুত করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি বলছ থাক,, "
আনারুল মুচকি হেসে ভাতিজার ঘারে হাত দিয়ে বলে —"হুম থাক আমরা তোকে বলে দেবো কয়টা গাড়ি লাগবে তাপরে তুই সেই কয়টা গাড়ি তৈরি করিস,,পারবি তো "
কিরিস —" ঠিক আছে, যখন লাগবে বলো,, at any time I will prepare car no matter how many it, "
আনোয়ার —" হুম ঠিক আছে এবার যা খেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়, বেশি কাজ করতে হবে না। কালকে আবার সকাল সকাল উঠবি তখনই গাড়ি কথা বলে দেবো আর কি কি লাগে সব বলে দেবো আমি আর আনারুল দেখছি "
কিরিস ওখান থেকে চলে যায় আর তখন তার ফোনে আবার মার্ক ফোন দেয়,, কিরিস মার্কের সাথে এবার আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিষয়ে কথা বলতে বলতে চলে যায়,,, "
ওইদিকে ছাদের উপরে সবাই মজা করে হাসতে করে ক্লান্ত হয়ে যায়,। সবাই মিলে হালকা হাসি, ঠাট্টা, পরিকল্পনা— মেহেদির রাত যেন হয়ে ওঠে একটা উৎসব। রাতে সবাই খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ে কালকে আবার বিয়ে সঙ্গে গায়ে হলুদ খুবই ব্যস্ত থাকবে সবাই তার জন্য সকাল সকাল উঠতে হবে,,,।
পরদিন সকাল। ভোরের আলো উঠতেই বাড়ি আবার ব্যস্ত হয়ে যায়। প্রত্যেকটা বাড়ির কোণা যেন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, যে যার মত কাজ গোছাতে ব্যস্ত। আজ বাড়িতে নতুন বউ আসবে,, সবদিক থেকে সবকিছু গোছানোর চেষ্টা করছি সবাই আর এই বিয়ে যার তাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠানোর জন্য তার কাজিনরা ঘরে গিয়ে তার ঘুম হারাম করে দিয়েছে,,।
রিহানকে উঠিয়ে আনা হয়, আজ তার গায়ে হলুদ।
ওর গায়ে পরানো হয়েছে সাদা পাঞ্জাবি। চুপচাপ বসে আছে গার্ডেনের মাঝখানে।
এক এক করে মেয়েরা এগিয়ে আসে, হলুদের থালা হাতে—
হালকা হাসি, ঠাট্টা, চোখে জলও।
Ray Chowdhury House Garden, সকালবেলা | শান্ত আলো, ফুলে সাজানো গার্ডেন | মৃদু শীতল বাতাস
গায়ে হলুদের আসর বসেছে। হলুদে রাঙানো গার্ডেন, বেলি-গন্ধরাজে ভরা বাতাস।
তাল বেতের ছায়া গায়ে মেখে প্রথম এগিয়ে এলেন রিহানের মা প্রিয়া। সবার আগে কপালে এক ফোঁটা হলুদ তুলে দিলেন ছেলের কপালে।
কিন্তু এই সম্মান প্রথমে দেওয়া হয়েছিল মির্জা বেগমকে। তিনি বিনীত গলায় বলে উঠলেন—
— “মায়ের চেয়ে বড় কেউ হয় না, বুঝেছো? আগে আমার ছোট বউমা ছেলের গায়ে হলুদ দেবে।”
তার কথামতো প্রিয়া সামনে এসে রিহানের কপালে হলুদ দিলেন। চোখের কোণে এক বিন্দু জল গড়িয়ে পড়লো—
আজ তার একমাত্র ছেলের বিয়ে।
এরপর একে একে মির্জা বেগম, সুপ্রিয়া, বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে রিহানকে আশীর্বাদ আর হলুদের রঙে রাঙিয়ে দিলেন।
কাজিনদের কাণ্ডকারখানা
রিহান চুপচাপ বসে আছে। এবার শুরু কাজিনদের হুল্লোড়। সুরভী আর বাকিরা হাতে ভরতি হলুদ নিয়ে একসাথে এগিয়ে এল।
রিহান ভয়ে বলে উঠল—
— “এই আমি একটু পরে বিয়ে করতে যাবো! এত হলুদ মাখালে তো আমায় চেনা যাবে না! আম্মু, এদের বারণ করো প্লিজ!”
আরোবি শয়তানি হাসি দিয়ে জবাব দিল—
— “জীবনে তো বিয়ে একবার হয়। গায়ে হলুদও একবার! তাই বেশি করে মাখতে হয়!”
সুরভী হেসে বলে—
—“আর তুইই তো বলছিলি, তোর বিয়ে কিন্তু তোর বর-বর ফিল হচ্ছে না। এখন হচ্ছে তো বুঝি?”
রিহান মুচকি হেসে স্বীকার করল—
— “হুম, এখন সত্যি মনে হচ্ছে আমি বর!”
পাশ থেকে ইশান বলে উঠল—
— “আর বর না, বলির পাঠা!”
তারপর জারাকে কনুই দিয়ে হালকা ঠেলে বলে—
—“আমি কবে হবো এমন?”
জারা খ্যাঁক করে উত্তর দেয়—
— “আগে মর, তারপর হ!”
সব কাজিন মিলে রিহানকে হলুদের ভূত বানিয়ে দিলো। রিহান কিছু বলতে পারছে না— কেবল চুপচাপ বসে আছে কাঁদা হলুদের মধ্যে।
হঠাৎই ধীর পায়ে এগিয়ে এল বাড়ির বড় ছেলে— কিরিস।
হাতে সামান্য হলুদ, চোখে সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
— “আর কোথায় মাখাবো? গায়ে তো জায়গাই নেই দেখছি— মুখে মাখাবো নাকি?”
তার কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল।
কিরিস এরপর এগিয়ে এসে রিহানের গালে আলতো করে হলুদ মেখে দিল। একেবারে নির্লিপ্ত, কিন্তু স্নেহ মাখানো এক টুকরো মুহূর্ত।
হলুদ মাখানো শেষ হলে রিহানের গায়ে পানি ঢালা হয়। এরপর বাড়ির বড়রা ধীরে ধীরে চলে যেতে থাকে।
এখন শুধু গার্ডেনে রয়ে গেছে ‘বদের দল’ — আরোবি,সুরভী, জারা,তিশা,লিজা,ইশান, কাবির,,ইয়াবি আর তাদের দস্যিপনা।
আরোবি সবার গায়ে হলুদ লাগিয়ে দিলেও নিজের গায়ে লাগেনি। এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
এমন সময় কেউ এসে তার দুই গালে এক চিমটি করে হলুদ মেখে দেয়।
“আহ! কে রে? কোন শালা আমার গায়ে হলুদ লাগায়!! আরে ইয়াবি! দাঁড়া!”
ইয়াবি হেসে দৌড়—
“আমায় ধরতে পারবি না!”
আরোবি তার পিছু পিছু ছুটে—
“আজ তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না!”
শাড়ি পড়া আরোবি দৌড়াতে পারছে না ভালো করে।
কাদামাখা গার্ডেন— পড়ে যাওয়া মাত্রই নিশ্চিত ৪ মাস ব্যথা থাকবে।ইয়াবি হুঁশিয়ার করল—
“দাঁড়া বলছি! পড়ে যাবি!…”
কে শোনে কার কথা!
পায়ে শাড়ি বেধেঁ হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় আরোবি। কিন্তু তার তো একা পড়া মানায় না—
শুধু একা পরবে কেন?
ইয়াবির শার্ট ধরে টান দিলো আরোবি— দুজনেই গিয়ে পড়ল কাদায়!
“আমার কোমর... এই আটার বস্তা উঠ! তাকিয়ে আছিস কেন?”
ইয়াবি থমকে গেছে। আরোবির দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টিতে।
একটা অন্যরকম অনুভূতি।
“ওহ সরি… দাঁড়া, আমি উঠছি। তুই সাবধানে উঠ!”
হাত বাড়িয়ে টেনে তুলল আরোবিকে।
আরোবির পায়ে লেগেছে, ইয়াবি ওর মাজা ধরে—
আরোবি চমকে উঠে—
“এই! কি করছিস তুই!”
ইয়াবি মুচকি হেসে বলে—
“গোর পায়ে লেগেছে। আর সাজুগুজু করবি এখন, তাই নিয়ে যাচ্ছি।”
আরোবি আর কিছু মনে না করে ওর ভরসায় হাঁটতে থাকে।
লিসি গার্ডেনের পাশে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে , দুই গাল ও হাতে হলুদ মাখা।
দৌড়াদৌড়িতে শাড়ির পিন খুলে গেছে, আঁচল কাঁধে চাপিয়ে রাখতেই পাশ থেকে পেটের একাংশ দেখা যাচ্ছে একটু সাহসী, একটু হট।
শাড়ি সামলাতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যেতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই...
একদম পিছন থেকে কিরিস তাকে শক্ত করে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয়।
লিসি চোখ বন্ধ করে ফেলে।
কিরিস – “চোখ নেই? দেখে চলতে পারো না?”
লিসি – “হুম আছে তো… এবার ছাড়ুন!”
কিরিস ঠাণ্ডা গলায় বলে—
“ছেড়ে দেবো সত্যি?”
লিসি – “না না! আগে উঠান!”
কিরিস লিসিকে দাঁড় করিয়ে চোখ বুলিয়ে নেয়— পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
লিসি অস্বস্তিতে কাঁপা গলায় বলে—
“এভাবে কি দেখছেন?”
কিরিস – “হুম, সব দেখছি… এভাবে কে শাড়ি পরে?”
তার চোখ পড়ে লিসির গালে হলুদে, আর নিজের হাতে একটু হলুদ।
লিসি বলল—“শাড়ির আঁচলের পিন খুলে গেছে, সরেন তো, আমি যাবো।”
কিরিস চোখ বড় করে বলে—
“কি? এভাবে যাবে? লোকে কি করে তাকাবে!”
লিসি – “আপনি যেভাবে তাকাচ্ছেন সেভাবে সবাই ও তাকাবে।”
কথাটা শুনে কিরিস একদম থমকে যায়। তারপর গম্ভীর ও রাগী গলায়—
“কি? ভাবনা-চিন্তা করে বলছো তো তুমি? এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো!”
লিসি গুটিয়ে যায়, গলায় নরম সুর—
“রাগ করছেন কেন?”
কিরিস একটু শান্ত হয়ে বলে—
“হুম... শাড়ি ঠিক করে এখান থেকে নড়বে না। যদি কেউ তোমাকে এই অবস্থায় দেখে…”
লিসি – “না এখন পারবো না! পিন নেই, একটা আছে মাজার কাছে কিন্তু হাত দিলে শাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে! আপনি প্লিজ সরে যান, আমি উপরে গিয়ে শাড়ি বদলে নিচ্ছি একেবারে…”
এতটুকু বলতেই কিরিস এক হাত দিয়ে লিসির কোমরে স্পর্শ করে।
উন্মুক্ত পেটে হাত লাগতেই লিসি চমকে উঠে—
“আহ! কি করছেন আপনি!!”
কিরিস – “চুপ! একদম।”
তারপর সে নিজ হাতে লিসির শাড়ি ঠিক করে দিতে থাকে।
লিসি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে— কোনো ভাষা নেই তার মুখে।
কিরিস – “এবার যাও। মুখ কেন এমন করেছো? আগে তো যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিলে! এবার যাও।”
লিসি কোনো কথা না বলে, গডগড করে চলে যায়।
যা-ই বলুক, আর একটা কথা বললেই তর্ক বাড়বে।
কিন্তু তার হৃদয়ের ভিতর কিরিসের সেই স্পর্শ— গায়ে রয়ে গেছে।
সোজা ঘরে ঢুকে পড়ে লিসি। গোসল করতে যাবে সে। তার আগে আরোবি গোসল সেরে ফেলেছে, এখন ডিভানে বসে ফোন ঘাঁটছে। পাশে বসে সুরভী গভীর মনোযোগে উপন্যাস পড়ছে।
লিসিকে দেখে সুরভী বলে— — “এই, দ্রুত নে! আবার খেতে যাবো, তারপর তো মেকআপ আর্টিস্ট আসবে।”
লিসি ক্লান্ত কণ্ঠে বলে— — “হুম, একটু খানি সময় দাও!”
ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে লিসি। হাত-মুখ ধুয়ে সাড়ে, শাড়ি খোলার সময় এক ঝলক তাকাতেই দেখে মাজায় কোথা থেকে হলুদের দাগ!
চমকে ওঠে সে। মুখে, হাতে তো সবাই মেখেছে, কিন্তু মাজায়?
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মনে পড়ে কিরিসের কথা...
— “ভাইয়া লাগিয়েছে নাকি… কিন্তু কখন? আমি তো বুঝতেই পারিনি... নাকি আমি নিজেই লাগিয়েছি শাড়ি ঠিক করতে গিয়ে? ওফ... বাদ দে! আগে ঠান্ডা এক লম্বা গোসল দিই।”
একটু পরেই লিসি বের হয়। মাথায় টাওয়াল প্যাঁচানো, চুল মুচতে মুচতে বলে— — “আমার হয়ে গেছে!”
সুরভী বই থেকে মুখ তুলে তাকায়— — “আরেকটু দেরি করতিস, তাহলে আরেকটা পাতা পড়ে ফেলতাম!”
আরোবি ফোন রেখে বলে— — “তুই সারাদিন এই উপন্যাস পড়িস, তাও মন ভরে না...!”
সুরভী কিছু না বলে মুচকি হাসে। লিসি চুল আচড়ে গুছিয়ে নেয়। তারপর সবাই মিলে নিচে নেমে আসে। বাইরে গার্ডেনে আত্মীয়-স্বজন সবাই খেতে বসেছে।
অনেক মানুষ এসেছে বলে কিরিস বাইরের গার্ডেনে দারুণ সুন্দরভাবে খাওয়ার আয়োজন করেছে।বাড়ির গার্ডেন এখন জমজমাট—সবাই খেতে বসেছে। কিরিস নিজ হাতে আয়োজন করেছে বড় পরিসরের, বাইরেই খাবারের ব্যবস্থা। বাড়ির ভেতরে মাত্র কয়েকজন, আর বাকিরা সব গার্ডেনেই।
তিন বোন—সুরভী, লিসি আর আরোবি—একসাথে টেবিলে বসে।
সুরভী প্লেট টেনে নেয় নিজের জন্য, আরোবি আগেই বলে দিয়েছে, সে হাত দিয়ে খাবে না।
বিয়েবাড়িতে মেয়েদের কাজ নেই, সব ছেলেরা সামলাচ্ছে। সুরভী এবার আরোবিকে গালে তুলে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে।
লিসি না খেতে চাইলে তাকেও গালে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে সুরভী।
সবার দেখা যায়—টেবিল ছেড়ে নিচে মেঝেতে বসে খাওয়া-দাওয়া করছে তারা।
সুরভী মাঝখানে, এক পাশে লিসি, অন্য পাশে আরোবি।
তাদের এমন খেতে দেখে প্রিয়া এগিয়ে আসে— — “তোরা টেবিলে না বসে মেঝেতে বসছিস! আচ্ছা যাই হোক, দ্রুত শেষ কর। একটু পরেই সবাই বেরোবে, তোদের তো আবার সাজগোছ করতেও টাইম লাগে। নে, শেষ কর!”
মেয়েরা খেতে খেতে কথা বলছে, এদিকে ছেলেরা বাইরের কাজ সেরে ঘামে ভিজে গার্ডেনে ফিরে এসেছে।
কেউই সোজা বসছে না, মেয়েদের গা ঘেঁষে বসে একটু ঠান্ডা বাতাস খাচ্ছে।
তাদের দেখে লিজা চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করে— — “এই অবস্থা কেন তোদের? বাবা বরেরও তো সেম অবস্থা!”
ইয়াবি হাসতে হাসতে বলে— — “ওরে বাইরে কী গরম! পুরা আলু ভর্তা হয়ে গেছি! আর আমাদের কথা বাদ দে, কিরিস তো পুরো গোসলই করে ফেলেছে ঘামে!”
তিশা একগাল হেসে বলে— — “সকালে কিছু খেয়েছিলি তুই?”
ইয়াবি ঠোঁট বাঁকায়— — “না রে, এবারই খাবো... কিন্তু ইচ্ছে করছে না...!”
ইশান লিসি আর আরোবির দিকে তাকিয়ে বলে— — “তোরাও এভাবে বসে আছিস কেন?”
আরোবি দুষ্টু হেসে বলে— — “দেখ না, আমাদের বড় বোন আমাদের খাওয়ায় দিচ্ছে...!”
কাবির সবার সামনে বলে— — “হুম... দেখি!”
তিশা তখন কাবিরকে টেনে নেয়— — “এই, এইদিকে আসো...!”
তিশার ডাকে কাবির যায়, আর ওকেও গালে তুলে খাইয়ে দেয় সে।
এ দৃশ্য দেখে ইয়াবি হালকা রাগে বলে— — “এই কাবির! ভুলে যাস না, আমি তিশার বড় ভাই!”
কাবির মজা করে মুখে খাবার পুরেই বলে— — “হুম শালা বাবু! এটাও ভুলবো না যে আপনি আমার ভাই...!”
সবাই হেসে ওঠে।
তাদের হাসির মাঝে লিজা হেসে বলে— — “ভাইয়া, এখানে আসো... আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোমায়!”
ওদের এমন করে খেতে দেখে ইশান জারা পাশে এসে দাঁড়িয়ে মজা করে বলে—
“আমাকেও একটু দাও!”
জারা তাকিয়ে বলে—
“জুতো খাবি?”
ইশান কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলে—
“আরে খাওয়া যায় নাকি! আমি তো জানতাম না! তবে তুমি যদি খাও, তাহলে আমিও রাজি...”
জারা ভ্রু কুঁচকে বলে—
“আগে সর, নাহলে কিন্তু মাকে ডাকবো!”
ইশান কিচ্ছু না বলে মুখ ফুলিয়ে বলে—
“আমি ডাকছি... ও মা...!”
জারা এক ধাপ এগিয়ে—
“এই তোকে আমি...!”
তার এমন রিয়্যাকশনে ইশান মুখ ফুলিয়ে বলে—
“কেউ খেতে চাইলে এমন করে না...!”
সুরভী হেসে বলে—
“আর দে না বেচারাটাকে!”
জারা একটু নাক শিটকে সালাদটা তুলে গালে দেয় ইশানের মুখে।
ইশান চোখ বন্ধ করে বলে—
“আহ্... অমৃত!”
চারদিকে হাসির রোল পড়ে যায়।
হাসির মাঝে রিহান বলে—
“দাড়া... আমায় আগে বিয়ে করতে দে! আজ আমার নুসরাত নেই...!”
লিসি মুচকি হেসে বলে—
“তাই কি হয়েছে ? বড় বোন তো আছে!”
সুরভী এবার হেসে বলে—
“হুম, ঠিক কথা! কাল থেকে না হয় বউয়ের হাত থেকে খাস, এখন বস! আমি খাওয়াই দিচ্ছি। মা কিন্তু তাড়াতাড়ি করতে বলেছে!”
সবাই একসাথে খাওয়া আর হালকা আড্ডায় ব্যস্ত। খাওয়া শেষ হলে সবাই একটু রিলাক্স করছে, কেউ চেয়ারে হেলান দিয়ে, কেউ নিচে বসে গা এলিয়ে দিয়েছে।
এমন সময়, সুরভীকে তার মা ডেকে নেয়। সুরভী উঠে মায়ের কাছে চলে যায়।
হঠাৎ হলরুমে প্রবেশ করে কিরিস।
চারপাশের আলো যেন এক মুহূর্ত থেমে যায়...
সাদা শার্ট, ঘেমে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আছে। মাথার চুলগুলোও ভিজে কপালে ঝুলছে।
তীব্র পুরুষালি গাম্ভীর্যে, কাউকে না দেখে, চোখ না তুলে সে চলে যায় এক কোণে, এসির নিচে নিজের জায়গায় বসে।
লিসি স্তব্ধ।
ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে সে।
সাদা শার্ট ভিজে থাকায় কিরিসের শরীরের গঠন যেন আরও স্পষ্ট... নিখুঁত... তীক্ষ্ণ... যেন মডেলের মতো।
সেই সময় সুপ্রিয়া বলেন—
“মা, যা তো… গিয়ে কিরিসকে ফ্রিজ থেকে সালাদ আর ড্রিংকসটা দিয়ে আয়। আমি এদিকের কাজটা করিনি।”
সুরভী তখন হাতে একটা ট্রে সাজাচ্ছে। ব্যস্ত কণ্ঠে লিসিকে ডাকে—
“শোন লিসি… একটু কিরিস ভাইয়াকে সালাদ আর ড্রিংকস দিয়ে আয় না। আমি উঠতে পারছি না, দেখ তো আমার হাতে কত কিছু! প্লিজ, জানা প্লিজ!”
লিসি মুখে কিছু না বললেও, মনে মনে ফোঁস করে ওঠে—
“শালা... সব সময় এই হিটলারের সামনে আমিই কেন ফেঁসে যাই!”
চোখ উল্টিয়ে সে কিচেনে যায়।
ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা সালাদ আর ড্রিংকস বের করে ট্রেতে সাজিয়ে নেয়।
তারপর কিরিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়…
কিন্তু চোখ তুলে তাকায় না। এক দৃষ্টিতে ট্রের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায়, যেন কিরিসের উপস্থিতি অনুভবই করছে না।
লিসি চুপচাপ কিরিসের পাশে বসে আরেকটা প্লেটে সার্ভ করছে। একে একে খাবার তুলে দিচ্ছে।
হঠাৎ কিরিস বলে ওঠে—
“আরে আর কত দেবে? আমি এত খেতে পারবো না…”
লিসি চোখ তুলে দেখে, সত্যি… প্লেটটা সে প্রায় উপচে ফেলেছে!
এক মুহূর্তে ভ্রান্তবোধ হয়। দ্রুত হাত বাড়িয়ে অতিরিক্ত খাবারগুলো তুলে নেয় সে।
তারপর ট্রে নিয়ে সরে যেতে যায়, ঠিক তখনই কিরিস বলে—
“এই, এটা নাও।”
লিসি থমকে দাঁড়ায়। মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে—
কিরিস হাত বাড়িয়ে তার দিকে ঘড়িটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
একটা কালো মেটাল স্ট্র্যাপের দামি ঘড়ি… চকমকে… আধুনিক।
লিসি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে—
“আপনার ঘড়ি আমি নিবো কেন?”
কিরিস ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে—
“নিতে বলছি না। ধরো, পরে নিয়ে নেবো।”
লিসি জবাব দেয়—
“না নিবো না, আপনার কাছে রাখুন!”
কিরিস এবার ধীরে বলে—
“এটা আজ কিনেছি। বুঝেছো? এটা রাখো। পরে নিয়ে নেবো আর হ্যাঁ আমি কিন্তু এটা বিয়ে বাড়ি গিয়ে নিবো তাই তোমার ব্যাগে রেখো।”
লিসির কণ্ঠ আরও কঠিন—
“তাতে আমার কী? আপনি মামিকে দিন!”
কিরিস এবার হালকা রাগে গলা চড়িয়ে বলে—
“তোমাকে বলছি, বুঝেছো? তাহলে আবার মাকে বলবো কেন?”
লিসি মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে—
“আহ! আমি পারবো না…”
এক মুহূর্ত থেমে…
কিরিসের লুক বদলে যায়।
চোখে কেমন এক ধরনের গা ছমছমে গভীরতা, ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।
একটানা তাকিয়ে থেকে কেমন নেশা ভরা কণ্ঠে বলে—
“যদি না নিও, তাহলে সেই রাতে যা করেছিলাম…
তা কিন্তু আবার… এখন… করবো…”
এই বলে ঠোঁটটা হালকা করে একবার নিচে স্লাইড করে।
লিসির গা কেঁপে ওঠে।
তার গলার লোম খাড়া হয়ে যায়।
কিরিস কী মিন করছে, সেটা এত স্পষ্ট, তবু এত অস্পষ্ট…
যেন মনে হচ্ছে, আবারও সে সেই রাতে ফিরে যাচ্ছে… অন্ধকার আলোয়, জোর আর নরমতার মাঝে…
লিসি হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলে—
“আপনার লজ্জা করে না? এখানে এসব কথা বলছেন?!”
কিরিস ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে—
“না, কারণ আমি নির্লজ্জ… বুঝতে পেরেছ?
এবার নেবে… না…”
আর কিছু বলার আগেই—
লিসি কিরিসের হাত থেকে ঘড়িটা ছোঁ মেরে নিয়ে এক দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরের দিকে ছুটে যায়!
চুল ছুঁয়ে যায় তার গাল। গলার নিচে এখনও কিরিসের গলায় ভেসে আসা কথার কম্পন কাঁপছে…
কিরিস চুপচাপ বসে থাকে।
তাকিয়ে থাকে লিসির যাওয়ার দিকে।
তারপর ধীরে পাশ থেকে একটা কাঁটা চামচ তোলে…
প্লেট থেকে খেতে শুরু করে।
চোখে… সেই চিরচেনা ঝড়।
সকালের ব্যস্ততা একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে উপরের ফ্লোরে। যে যার মতো করে গোছগাছ শুরু করে দিয়েছে। মেকআপ আর্টিস্টরা একে একে আসছে, কেউ বসে আছে সাজের অপেক্ষায়, কেউ আবার হালকা টাচ-আপ নিচ্ছে আয়নার সামনে।
এই ভিড়ের মধ্যেই জারা মুখটা কান্না-কান্না করে বললো,
“আমি এই শাড়ি পরবো না! মনে হচ্ছে এখুনি খুলে যাবে…”
সুরভী তখন চোখ ছোট করে কঠিন গলায় বলে উঠলো,
“যদি শাড়ি চেঞ্জ করার কথা মাথায় আনলে, তোর মাথায় ইট মেরে ফাটায়া দিমু! সারাদিন তো শার্ট-গেঞ্জিতে থাকিস কিছু বলি না, কিন্তু আজ শাড়ি পরতেই হবে।”
আরোবি হেসে বলে উঠলো,
“এই জারা পর, সুরভী আজ একদম বড় আপুর মুডে আছে!”
চারপাশে হেসে ওঠে সবাই। যেন এটাই একটা অলিখিত নিয়ম—শাড়ি মানেই আত্মা ছুঁয়ে যাওয়া উৎসব।
সবাই যখন সাজের তোড়জোড় নিয়ে ব্যস্ত, তখন লিসি একটু দূরে এক কোণে চুপচাপ বসে আছে, হাতে ফোন। তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে লিজা বলে ওঠে,
“এই লিসি! তুই গুছাবি কখন? সবাই চলে যাবে তোকে রেখে!”
লিসি মুচকি হেসে বলে,
“হ্যাঁ, এইতো,, আমার বেশি সময় লাগবে না!”
সে উঠে পড়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে যায় আলমারির দিকে। ইয়াবি ভাইয়ার দেয়া ব্যাগগুলো খুঁজে বের করে একটায় লেখা—"বিয়ের জন্য"। সেই ব্যাগটা তুলে নিয়ে খোলে, আর সেখান থেকে বের করে একটা পাতলা আকাশি রঙের শাড়ি—নরম যেন তুলো, হাতেই গুটিয়ে যায়। সঙ্গে সাদারঙা ব্লাউজ।
ব্লাউজটা হাতে নিয়ে সে একটু তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ে যায়, ঠিক এমন হালকা কাজ করা ব্লাউজ কিরিস সেদিন পছন্দ করে বলেছিল। ওর মনের অজান্তেই ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
চোখে মুখে একটা শান্ত ছোঁয়া নিয়ে ও চলে যায় ওয়াশরুমে। শাড়ি পরতে পরতে এক ফাঁকে ভাবে—
"আমি যে কখনও অত গর্জিয়াস সাজে স্বস্তি পাই না, সেটা ভাইয়া জানলো কী করে? নানু বলেছে নাকি? নাহ, ইয়াবি ভাইয়া যেসব জামা দিয়েছে, সব এত কমফোর্টেবল,কি করে,,?..."
শাড়ি পরে বের হতেই লিসিকে দেখে সুরভী বলে ওঠে—
“তোকে তো সেই লাগছে! শাড়িটা একদম মানিয়ে গেছে তোর গড়নে।”
সেই কথায় সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকায় লিসির দিকে। লিসি একটু থমকে যায়… একসঙ্গে এতগুলো চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়ে গেছে।
তিশা বলে,
“হয়েছে তো! এখন তুই একটু সাজ!”
লিসি একটু পিছিয়ে গিয়ে বলে,
“না, আমি সাজবো না। ভারি মেকআপ আমার একদম ভালো লাগে না। সিম্পল থাকাই ভালো।”
মেকআপ আর্টিস্ট এগিয়ে এসে নরম গলায় বললো,
“ঠিক আছে ম্যাম, আপনি যেমনটা চান, তেমনভাবেই সাজিয়ে দিচ্ছি।”
তবু লিসির চোখে কিছুটা অনাগ্রহ।
এই সময় আরোবি এসে লিসির কাঁধে হাত রেখে বলে,
“শোন, তোকে সাজতেই হবে! মশাটা কে তোর রুপের আগুনে পুড়াতে হবে, বুঝলি?”
‘মশা’ শুনেই বাকিরা একটু থেমে যায়। লিসির চোখ বুঝে যায়—আরোবি কাকে ইঙ্গিত করছে।
সে ফিসফিস করে বলে,
“আমি পারবো না,,?”
আরোবি এবার সরাসরি হুমকির স্বরে বলে,
“তুই না সাজলে আমি সবাইকে বলে দেবো মশাটা কে!”
এবার লিসি বোঝে—আরোবি থামবে না। শেষমেশ সে রাজি হয়, তবে একটা শর্ত দেয়:
“শোনেন, আমাকে একদম হালকা সাজাবেন। এমনভাবে সাজাবেন যেনো আমি আমিই থাকি, একদম হালকা,“
মেকআপ আর্টিস্ট হেসে মাথা নেড়ে বলে,
“একদম আপনার মতো সাজিয়ে দেব ম্যাম।”
সাজ শুরু হয়। হালকা টোনের মেকআপ, চোখে সামান্য কাজল, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। চুল বরাবরই খোলা থাকে। এই সময় আরোবি বলে,
“এক কাজ করুন, লিসির মাথায় এমন ডিজাইন করে দিন যেন এক পাশে ফুল রাখা যায়। এইভাবে, হ্যাঁ… এমনভাবে।”
চুলের মাঝখানে একটা টুইস্ট করে ফুল রাখার স্পেস রাখা হয়। ঘন কালো চুল খোলা রেখেই মাঝখানটা ভাঁজ করে স্টাইল করা হয়। সাজ শেষ হতে হতে যেন একটা শিল্পকর্ম তৈরি হয়ে যায়।
তিন-চার ঘণ্টার সাজগোজ শেষে মেয়েরা একে একে নিচে চলে আসে।
লিসি ওপর থেকে দাঁড়িয়ে কিছু দরকারি জিনিস গুছাচ্ছিল নিজের ব্যাগে,

0 Comments