উপন্যাস : তোমাকে চাই

লেখিকা : নুসরাত জাহান মিথিলা


অন্যদিকে, বাড়ির দোতলায় নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে কিরিস।
আজ একটা জরুরি বিজনেস মিটিং আছে সিঙ্গাপুরে—
বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুই-তিন ঘণ্টার পথ, তাও নিজস্ব প্রাইভেট জেট-এ যাবে।
মিটিং শেষে আজ সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসবে সে।
সুপ্রিয়া এসে কফির কাপ রেখে যায়।
সুপ্রিয়া (নরম গলায়):
—"তোর তো মিটিং আছে, আমি কফিটা রেখে গেলাম।"
কিরিস (মুখ না তুলে):
—"Thanks, Mom."

কফির শেষ চুমুক দিয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘরের একপাশের চেঞ্জিং রুমে চলে যায়।
ওর আলাদা একটি বিলাসবহুল changing space আছে,
যেখানে দেয়ালের ভিতর সাজানো রয়েছে শার্ট, স্যুট, ঘড়ি, জুতা, সানগ্লাস, এবং প্রাইভেট পারফিউম শেলফ।
কালো চকচকে শার্ট, ব্ল্যাক প্যান্ট,,ব্ল্যাক ব্লেজার, সঙ্গে সিলভার পিন,,কফি কালারের কালচে টোনের "Sumukh" পারফিউম,,,,হাতের জন্য বেছে নেয় একটিমাত্র Arabic Balck ঘড়ি,,চুলে হালকা হেয়ার সেটিং,,,, পা জুড়ে শাইনিং কালো লোফার,
চেহারায় এক রাজকীয় স্টাইল—ধারালো চোখ, ঠোঁটে গম্ভীর এক ম্লান হাসি।
এমন সময় মার্ক ঘরে এসে টোকা দেয়—
মার্ক (চুপিচুপি):
"Boss, গাড়ি রেডি। Jet গেট ক্লিয়ার।"
কিরিস (ঘড়ি দেখে মাথা নাড়ে):
"চল।"
ওরা দু’জনে নিচে নামে।
বাড়ির সবাই তাকিয়ে দেখে— যেন পুরো জায়গা থেমে যায় এক মুহূর্তে।
এই সেই কিরিস, বাড়ির সবচেয়ে বড় ছেলে, শহরের দুর্দান্ত প্রভাবশালী নাম—
যার মতো লোক পাওয়া এই সময়ের সমাজে দুষ্কর।
বাবার সঙ্গে কিছু দরকারি কথা থাকায় কিরিস গার্ডেনের দিকে যায়,, আনোয়ার আর আনারুলের দিকেই এগিয়ে যায় কিরিস।
কিরিস (নম্র গলায়):
"আব্বু, আমি যাচ্ছি সিঙ্গাপুর—দুইটা প্রজেক্ট পিচ ফাইনাল আছে। সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসব ইনশাআল্লাহ।"
আনোয়ার মাথা নাড়ে।
আনারুল (হালকা হাসি দিয়ে):
—"সাবধানে যাস বাবা। দেশে এখন অনেক কিছুই অস্থির।"
ঠিক তখনি গার্ডেনের একপাশে লিসির মুখটা কিরিস দেখে ফেলে।
হাসছিল, কিন্তু হঠাৎ গোমড়া মুখ করে নেয়।
কিরিস এক ঝলক তাকিয়ে নিজের ঠোঁট কামড় দিয়ে মুচকি হাসে।
বোঝাই যাচ্ছে — কাল রাতের ঘটনা এখনও তার মনে।
লিসি, চোখ নামিয়ে নেয়। একটা লাজুক অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে মুখে।
তাড়াতাড়ি হলুদ গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ওদিকে কিরিস আর দেরি না করে গাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।
তাকে বিদায় জানাতে কেউ কেউ এগিয়ে আসে।
ইশান (চিৎকার করে):
—"ভাইয়া, তুই যা! আমরা সামলে রাখবো সব!"
কাবির:
—"ভাইয়া, তুই থ্রিড নাম্বার প্রজেক্টে একটু খেয়াল রাখিস, ওই জায়গাটা incomplete!"
রিহান:
—"সাইটের একটা ব্লক আছে, ভুলে যাস না!"
কিরিস (হালকা মাথা নাড়িয়ে):
—"Noted."
কিরিস চলে যাওয়ার পর আবার সবার ব্যস্ততা শুরু।
আরোবি, জারা, তিশা, লিজা — সবাই ঘরের ভেতর থেকে একে একে
তত্ত্ব, শাড়ি, হলুদ, মেহেন্দি, কাঁচা চুড়ি,, আলতা,ফল, আয়না,আরো কত কি…
সব কিছু সাজিয়ে গার্ডেনে নিয়ে আসে।
সবাই মিলে সেগুলো খুব সুন্দর করে সাজাচ্ছে—
আলাদা এক টেবিল সাজানো হচ্ছে ‘তত্ত্ব সাজানোর’ জন্য।
তারা জানে, বিকেলে তত্ত্ব যাবে কোনের বাড়িতে,
তাই এখনি সব গোছানো দরকার।
দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে যায়। মেয়েরা একে একে হালকা সেজে নেয়, যার যার মতো করে ক্যাজুয়াল ড্রেস পরে নেয় সবাই। লিসি শুরুতে যেতে চায়নি, কিন্তু যখন তার মুড একটু একটু করে ঠিক হতে শুরু করে, সে-ও রাজি হয়।
গেটের সামনে হাতে তত্ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে যায় সবাই। পিছন থেকে মির্জা, সুপ্রিয়া, প্রিয়া এবং পরিবারের কিছু বড় সদস্যরা এগিয়ে আসে।
মির্জা — "শোন গিয়ে তোরা তত্ত্ব দিয়ে চলে আসবি, সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবি…"
প্রিয়া — "আর হ্যাঁ তোদের ফুপি-খালাদের সাথে দেখা করে আসিস…"
আরোবি — "আরে মা, কোনো চিন্তা করো না, আমরা দেখে নেবো। আর লিসি তো আছে বউ-মেটেরিয়াল…"
লিসি হেসে ফেলে একটু লজ্জা পেয়ে।
সে হালকা বেগুনি থ্রিপিস পরেছে, সামনের চুলগুলো এক পাশে নিয়ে পেছনে স্ন্যাপ করে গুঁজে দিয়েছে। একদম মিষ্টি, শান্ত একটা লুক তার।
এদিকে রিহান মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে ছিল।
কাবির — "আরে মন খারাপ করিস কেন? কাল তো তুই যাবি একেবারে নিয়ে আসতে!"
রিহান — "হুম, গিয়ে ফোন দিস আর এরমধ্যে আমি আমেরিকার ছবি দেখি।"
ইশান — "You naughty boy! দেখ আমরা গেলাম। এই ইয়াবি, কি করিস তুই এখন?"
ইয়াবি ইতিমধ্যে কিরিসকে লিসির একটা ছবি পাঠিয়েছে। কিরিস ছবি দেখে সরাসরি ফোন দেয়। ভিডিও কলে সব দেখে নেয় কিরিস। ফোন কাটার আগে ইয়াবি বলে —
ইয়াবি — "চিন্তা করিস না, মাছ আমি নিয়ে যেতে দেবো না। এই তালা আমি গুছিয়ে রাখবো…"
(কোডে কথা হচ্ছে)
কিরিস — "তারপরে আমি কিন্তু পিকুর ছাড়ছি না…"
কাবির — "কথা বলা হলে চল…"
গাড়ি রওনা দেয়। বেলাভূমির মতো রাস্তা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়িগুলো, কিছুক্ষণ পরপর বাইরের আলো চোখে পড়ছে ছায়া ছায়া… গানের সুর বাজছে হালকাভাবে। কিন্তু ভিতরে লিসি কেমন যেন চুপচাপ।
প্রথমে একটু হেসে কথা বললেও, মাঝপথে তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। কাঁধটা হালকা কেঁপে ওঠে। আরোবি দেখে বলেও —
আরোবি — "লিসি তুই ঠিক আছিস তো?"
কিন্তু লিসি মাথা নাড়িয়ে চুপ করে থাকে।
এরপর বমি করে ফেলে জানালার পাশে হেলান দিয়ে। সবাই ভয় পেয়ে যায়।
তারপরে ওকে পানি খাইয়ে কিছুটা সামলে তোলা হয়। কিন্তু কারও নজর এড়ায় না— তার মুখটা যেন নিস্তেজ, জ্বর চলে এসেছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
গাড়ির ভেতরে বাকি সময়টা সে চুপচাপ থেকেছে। কেউ হাসছিল, কেউ গানে গলা মিলাচ্ছিল, কিন্তু লিসি শুধু এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে ছিল—গাড়ির কাঁচে ভেসে আসা রোদের ঝাপসা আলোয়।
নুসরাতদের বাড়ি ও ফিরে আসার পর…
তত্ত্ব দিয়ে ওরা সন্ধ্যা পেরিয়ে ফেলে। ফিরে এসে সবাই ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসে।
কিন্তু লিসির অবস্থা ভয়ানক খারাপ— সারা রাস্তা জার্নিতে বমি, মাথাব্যথা, গা গরম… আর এই অসুস্থতা যেন আরও ভয়ানক কিছু বলে দিচ্ছে, হয়ত তার ভেতরের অস্থিরতাও জ্বর হয়ে উঠেছে। কিরিসের এক kiss লিসি এই অবস্থা,,,,
সুপ্রিয়া পাশে বসে থাকে।
প্রিয়া গরম পানি নিতে গেছে।
মির্জা বেগম চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে বলে
—"এই রকম ওর হয় মাঝে মাঝে, অতিরিক্ত টেনশনে পড়ে গেলে, আবার বেশি গাড়িতে উঠতে পারে না…"
এদিকে ছাদে মেহেদীর আয়োজন প্রায় শেষ—ডেকোরেশন, আলো, ডিজে সব প্রস্তুত।
কিন্তু লিসি এই অবস্থায় যেতে পারবে কিনা, তা বোঝা যায় না।
সবার মুখে চিন্তা… কেউ পেছনে দাঁড়িয়ে, কেউ সামনে এসে দেখছে তাকে।
আরোবি — "আমি বলছিলাম, তোকে বাড়ি নিয়ে যাই। অর্ধেক রাস্তায় বললো, যাবে না…"
ইশান — "চিন্তা করিস না, আমি ওষুধ দিয়েছি। খেয়েছে। একটু রেস্ট নিক, ঠিক হয়ে যাবে।"
জারা — "দেখতো কি হয়ে গেল…"
আনোয়ার ও আনারুল এসে পৌঁছায়।
আনোয়ার — "এখন কমেছে মা?"
লিসি চোখ তুলে তাকায়।
চোখ লাল, ঠোঁট শুকনো, কিন্তু তার মাঝেও একটা অনিন্দ্য সৌন্দর্য।
সে বলে — "হু… মামা…"
মির্জা — "তোরা ফ্রেশ হয়ে আয়, সবাই। লিসি না চাইলে যাবে না, রেস্ট নিক।"
সবাই ছাদে চলে যায়।
নিচে হাতেগোনা ১০–১২ জন।
কিছুক্ষণ পরে বাড়ি ফেরে কিরিস,, গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় কিরিস।
অফিস থেকে ফিরে আসা ক্লান্ত একটা শরীর, কিন্তু চোখে নজর সজাগ।
সে দরজায় ঢুকে এক মুহূর্ত থেমে যায়। তার চোখ সোজা গিয়ে পড়ে লিসির মুখে।
শুকনো ঠোঁট, কপালে ঘাম, কাঁধ ঢেকে রাখা ওড়না— সব কিছু মিলিয়ে এতটাই দুর্বল দেখাচ্ছে যে নিজের বুকের ভেতর কেমন হালকা কাঁপন টের পায় কিরিস।
কিছু একটা ভেবে সে মাকে ডাকে।
ছেলের গলার আওয়াজ শুনে এগিয়ে আসে সুপ্রিয়া
সুপ্রিয়া — "কখন এলি? ঠিক ছিল তো সব? কোনো সমস্যা হয়নি তো?"
কিরিস — (চোখ নামিয়ে) "আমার তো কিছু হয়নি… কিন্তু এর অবস্থা এমন কেন?"
সুপ্রিয়া — "আর বলিস না… নুসরাতদের বাড়ি তত্ত্ব দিতে গিয়ে এই অবস্থা,, মাথা ব্যথা করছিল, তবুও গিয়েছিল। ফেরার পথে রাস্তায় বমি… তারপর জ্বর। ইশান ওষুধ দিয়েছে। আমি ছিলাম পাশে। ঘুমাচ্ছে বেচারি…"
এই কথা শুনে কিরিসের চোখে ধীরে ধীরে নেমে আসে একটা অদ্ভুত নীরবতা।
সে একটু জোরেই বলে—
"এখানে কেন রেখেছো? এইভাবে শুয়ে আছে, কমফোর্ট ফিল করছে? আমি নিয়ে যাচ্ছি ঘরে।"
সুপ্রিয়া চমকে যায়। এমনভাবে ছেলেকে বলতে শোনেনি সে আগে।
বুকের ভেতর মায়া জমে ওঠে।
সুপ্রিয়া — "যা, তবে নিজে নিয়ে যা। ওকে যেন বকিস না… ও তো তোর ছোট বোনে , ভুলে যাস না। আমি কিন্তু বলে দিলাম,,,,,, কফি খাবি নাকি?"
কিরিস — "না মা। তুমি বরং আমার কোল্ড ড্রিংসটা দিও। মার্ক, ব্লেজারটা ধরো।"
মার্কের হাতে ব্লেজার দিয়ে কিরিস সামনে এগিয়ে যায়।
সোফায় শুয়ে থাকা লিসির মুখের উপর এলোমেলো চুল, শুকনো ঠোঁট— এই অসুস্থতার মাঝেও তাকে অলৌকিক সুন্দর লাগছে।
একটা নিঃশ্বাস নেয় কিরিস… যেন বুকের মধ্যে কেমন ভীষণ ভার জমে আছে।
সে আলতোভাবে লিসিকে নিজের কোলে তুলে নেয়।
যেভাবে গাছ থেকে পরম মমতায় তোলা হয় একটা ফুল—
ঠিক সেভাবে।
চারপাশের লোকেরা তাকিয়ে দেখে—
কে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে দেখতে হবে না
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে কিরিস আরোবির ঘরের
কাছে এসে দেখে বন্ধ।
এক লাথিতে খুলে ফেলে দরজা।
হঠাৎ এমন দরজা খুলে বেডের উপরে বসে থাকা আরোবি চমকে ওঠে তারপর আরো অবাক হয় কিরিসের কোলে লিসি কে দেখে একটু নিজেকে সামলে বলে
আরোবি — "নক করলে দিতাম না? গ্যাংস্টারের মতো লাথি মারছিস?"
কিরিস — "চুপ কর… বালিশ ঠিক কর।"
আরোবি চুপচাপ এগিয়ে আসে।
কিরিস লিসিকে খাটে শুইয়ে দেয়, একটা ব্ল্যাঙ্কেট টেনে দেয় তার গায়ে।
তারপর বলে —
"ডিস্টার্ব করিস না। আমি রুমে গেলাম। ওকে ছাদে আনতে হবে না।"
কথা বলে চলে যায় কিরিস।
আরোবি তাকিয়ে থাকে দরজার দিকে তারমানে সে যেটা ভেবেছে আজ দেখছে সেটা সত্যি … তারপর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে —
"Lisi… you are the luckiest girl in the world…"
২–৩ ঘণ্টা কেটে গেছে…
ছাদের উপর সুর আর আলোতে বিয়ের মেহেদির প্রস্তুতি জমে উঠেছে। নিচে ঘরটা এখন প্রায় খালি। হঠাৎ এক সময় ধীরে ধীরে চোখ মেলে লিসি।
চোখের পাতায় যেন ঘুমের ভার তখনো রয়েছে। মাথাটা হালকা ঘোরের মধ্যে, সে ঠিক বুঝতে পারে না—
কে ওকে এখানে এনে রেখেছে? কীভাবে এসেছিল?
সে একটু ধীরে উঠে বসে। তখনই লিসির পাশে বসে থাকা আরোবি হালকা হাঁ করে বলে—
আরোবি — "তুই উঠেছিস? ও মাই গড! এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলি জানিস, তুই এমন করে পড়ে ছিলি যে… আমি তো ভাবছিলাম হসপিটালে নিতে হবে!"
তারপর মুচকি হেসে বলে —
"কী ভাবছিস? কিসে এসে পড়েছিস জানিস না? বলি আমরাই এনেছি তোকে কোলে করে! কিরিস না থাকলে তোকে বোধহয় হেলিকপ্টার করে আনতে হতো!"
লিসি একটু অবাক হয়, চোখ বড় করে বলে—
"সত্যি? কে এনেছে?"
আরোবি—"হুম… বলব না! ভাবতে থাক, কে এমন বডিগার্ড মুডে বসে থাকতে পারে তোর পাশে? কিন্তু যাই হোক, এখন একটু উঠে আয়। উপরে সবাই মেহেদি দিচ্ছে। তুই যাসনি বলে আমি ও যাই নি—এই হচ্ছে তোর প্রতি ভালোবাসা, বুঝলি?"
লিসি হালকা হেসে পড়ে। এতক্ষণে শরীরটাও একটু ভালো লাগছে।
লিসি—"ভালো লাগছে একটু। জ্বরটাও মনে হয় কমেছে অনেকটা।"
আরোবি— "তাহলে একটা কাজ কর গোসল করে আয়…দেখবি অনেক ফ্রেশ লাগবে।"
লিসি ওর দিকে তাকিয়ে চুপ করে যায়, তারপর একটা ছোট হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে।
গোসলের পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। মনে হয় যেন সব ক্লান্তি ধুয়ে গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখে লিসি একটু চমকে যায়—চোখদুটোএখনও কিছুটা লাল, কিন্তু মুখে ফিরেছে সেই চিরচেনা আলো।
আজকের মেহেদি অনুষ্ঠানের ড্রেস কোড—"মেহেদি রঙা স্বপ্ন"
থিম অনুযায়ী, লিসির জন্য আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা ছিল একখানা সফট গাউন—একদম নরম মেহেদি রঙের, কিছুটা বেইজ আর অলিভ গ্রীনের মিশ্রণ।
সেই গাউনটা গায়ে দিয়ে সে যেন একদম একটা খোলা ফুলের মতো লাগছিল।
চুলগুলো খোলা রাখা, হালকা ওয়েভি করে স্টাইল করা, মাথার একপাশে একটা পাতলা জুঁইফুলের মালা পিন দিয়ে আটকানো।
মেকআপও হালকা—ন্যাচারাল বেস, গোলাপি গাল, চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে soft brown-pink।
গায়ে থাকা গাউনটা লেয়ার্ড আর লাইট ফ্যাব্রিক, যেন বাতাসে নিজেই নাচে।
আরোবি —" হুম হয়েছে চল,,, এমনি তে তোকে না সাজলে ও হুর পরী লাগে,,, "
লিসি মুচকি হেসে বলে —" হুম চলো আচ্ছা এই ফুলের মালা কে দেছে ,, "
আরোবি —"guess কর কে দিতে পারে,,, আরে আমি এনেছি,, চল তো এবার নাহলে ওরা সব মজা নিয়ে নেবে"
এরপর ওরা দুইজন উপরে দিকে যেতে থাকে যাওয়ার পথে সুপ্রিয়ার সাথে দেখা হয়,
সুপ্রিয়া —" আরে কনে যাস,, জ্বর কমেছে তোর, "
লিসি মাথা নেরে বলে —" হুম মামি কমেছে তাই তো যাচ্ছি না হলে যেতাম না,, "
সুপ্রিয়া—" কিছু খাবি,,, চা কিংবা অন্য কিছু "
লিসি—" না মামি "
আরোবি —" কি যত্ন,,, চল লিসি আর বড় আম্মু আমি খাবো,,, একটু,, না থাক, উপরে গেলাম,, "
লিসি উপরে আসে, আর অবাক হয়ে যায়।
সবাই উপরে বসে, ঝকঝকে আলো আর, মিউজিক বাজছে। ছাদের ওপরে fairy lights টানানো, সবার হাতে মেহেদি লাগানো হচ্ছে।
সে আসতেই সবাই আনন্দে ডেকে নেয়—
"এই লিসি এসেছে! চল আয় বস, মেহেদি পড়িস!"
একজন টেনে নেয় তাকে সবার মাঝে।
লিসি হেসে বসে পড়ে। মেহেদিওয়ালির পাশে জায়গা হয় তার জন্য।
মেহেদী আর্টিস তিশার হাতে দু-হাত ধরে মেহেদি পড়াচ্ছে।
ওদিকে একটা কোণে বসে কিরিস।
কাছে ল্যাপটপ খুলে কিছু কাজ করছে।
যখন লিসিকে আসতে দেখে, চোখ তুলে চেয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত।
তারপর আবার চোখ নামিয়ে নেয় নিজের স্ক্রিনে।
কিন্তু মন যেন ঠিক থাকছে না। বুকের গভীর কোথাও কিছু নড়ে ওঠে।
মেহেদিওয়ালি লিসির হাত নিচ্ছে তখন, আর ঠিক সেই মুহূর্তে কিরিস আবার তাকায় তার দিকে।
লিসি হেসে কিছু বলছিল পাশের কারো সঙ্গে, আর হঠাৎ চোখ আটকে যায় কিরিসের চোখে।
একটা মুহূর্ত…
চোখে চোখ পড়ে যায়।
ভিড়ের মধ্যে, মিউজিকের মাঝে, আলো ঝলমলে আবহা
তারা দু’জন একে অপরকে শুধু দেখে…
কোনো কথা নেই।
শুধু চোখে এক রকম অভিমান, আরেক রকম মায়া।
কিছুক্ষণ পরে,,,,,
আলো নেভা ছাঁদের এক কোণে, সবার থেকে একটু দূরে বসে লিসি,,,,
মেহেদী দেওয়া হাত দুটো দেখছে লিসি,, মেহেদীর রং লাল টকটক করছে,, মৃদু মৃদু বাতাসে তার চুলগুলো হালকা দুলে দুলে উঠছে,,
চারপাশে হালকা বাতাস বইছে, দূরে মেহেদির আলো জ্বলে আর নেভে। সবাই তখন নিজের মতো ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পরে লিসির অনুভব করে পিছন দিক থেকে কেউ আসছে লিসির বুঝতে বাকি নেই কে,,,
কিরিস চুপচুপ এসে বসে লিসির পাশে, কোনো কথা নেই তাদের মাঝে,,শুধু নীরবতা কিন্তু তারপরেও যেন এই নীরবতাই চিৎকার করে করে কথা বলছে,,,,, কিছুক্ষণ পরে
কিরিস একটু গম্ভীর গলায় বলে —
"এই কিসটা নিয়ে এত ভয় পাচ্ছো কেনো?আমি বাধ্য করেছি বলে… তুমি তো জানো, আমি তোমাকে কী রকম দেখি…"
লিসি আর কথা না বলে থাকতে পারে বলে দেয় তার মধ্যে জমা কথাগুলো,,,,
লিসি কাঁপা গলায় বলে —
"আপনি কি সত্যি জানেন, ওই রাতের পর থেকে আমি কতটা ভেঙে পড়েছিলাম?
আপনি যেভাবে বলেছিলেন… সেই ব্ল্যাকমেইল, সেই ভয়… আমি তো পুরো নিজেকে ছোট মনে করতে শুরু করেছিলাম।"
তারপর হঠাৎই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে লিসি।
শরীর কাঁপছে… কাঁধ থেকে দমকে উঠে কান্না… কিরিস হতভম্ব হয়ে যায়।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসে,
তারপর আলতো করে লিসিকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে।
কিরিস (নরম গলায় বলে) —
"এইরকম করে কান্না করোনা লিসি… প্লিজ। আমি জানতাম না তোমাকে এতটা কষ্ট দিয়েছি।
ওটা ভুল ছিল… আমি এমনটা আর কখনো করব না,,।
লিসি কেঁদে কেঁদে বলে —" স,,,ত্যি তো,, "
কিরিস —" না, সত্যি না, আমি বারবার এমন করবো,, "
কিরিসের এই কথায় লিসির কান্নার বেগ বেরে যায়,তারপর লিসি কাঁপা গলায় বলে —
আপনি বাজে লোক আমায় কি করে,,,,,,,
কিরিস একটু জোরে বলে —" চুপ একদম, কান্না করবে না, চুপ তোমার চোখে পানি মানায় না,, "
কিরিস আর কিছু বলে না, শুধু শক্ত করে জড়িয়ে রাখে।লিসি ও বাচ্চাদের মতো চুপচাপ করে কিরিসের বুকে মাথা রাখে,,,
কিছুক্ষণ পরে লিসি নিজেই ধীরে ধীরে মাথা তুলে, চোখ মুছে সোজা হয়ে বসে।
চুপ করে উঠে দাঁড়ায় লিসি।
কিন্তু যাওয়ার সময়, কিরিস হঠাৎ তার ওড়নার আঁচলটা ধরে টেনে ধরে।
লিসি পেছন ফিরে তাকায়, চোখে জল জমা।
কিরিস নিচু গলায় বলে —
"মাফ করবে তো আমায়, অলকানন্দা ?"
এক মুহূর্ত…
লিসি একটু অবাক হয়ে যায় "অলকানন্দা" নাম শুনে কিন্তু তারপরে ও লিসি মুখের কোণে এক অজানা হাসির রেশ ফুটে ওঠে, লিসির কাছে এই নাম কেন জানি মনে হয় এটা ওর নিজেরই নাম,,,
লিসির ঠোঁটে মিষ্টি এক হাসি এসে পড়ে।
সে বলে — "হুম…"
তারপর ধীরে ধীরে চলে যায়। লিসি মুখে হুম শুনে কিরিসের মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে, লিসির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ধীর সুরে বলে —
" আমার অলকানন্দা "

রাতের ছাদে আজ কোনো ডিজে নেই, কোনো পারফর্মার নেই। ক্যামেরাম্যান মেহেদী অনুষ্ঠানের কিছু বিশেষ বিশেষ ক্লিপ নিয়ে রেখে দিয়েছে এবার সবাই একটা অন্যরকম খেলা করবে বলে ভেবে নিয়েছে ছাদের এই নির্মল পরিবেশ আর এই মৃদ বাতাস আর চারপাশের এই ঝিকিমিকি আলোয় সবাই ভাবলো কিছু একটা করা যাক।এতক্ষণে লিসি ও আগের মতন স্বাভাবিক হয়ে গেছে,যেন ভিতরটা একদম হালকা হয়ে গেছে লিসির, সেই আগের মিষ্টি হাসিটা মুখে বিরাজ করছে এখন,,,
যেমন ভাবা তেমন কাজ,, সবাই বসে আছে গোল হয়ে।
একটা ছোট্ট কাগজের বাটি ঘোরে এক জন থেকে আরেক জনের হাতে।
সেই কাগজে আছে —
বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, ইস্পানি, রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে পুরোনো লোকগান পর্যন্ত!
কেউ হেসে বলে —
"আরে, আমার ভাগ্যে ইংরেজি গান এসেছে! আমি তো ঠিক মতো উচ্চারণই পারি না!"
কেউ আবার ইস্পানি গান দেখে হেসে কাঁপছে—
"এইটা কে দিয়েছে? আমারে মারার প্ল্যান করছিস?"
ইশান গায় "Shape of You",
যেটা গাওয়ার সময় জারাকে টিস করতে বাদ দেয় নি,,
কাবির গায় হিন্দি "Tum Hi Ho",
তিশা গায় "ভালোবাসি তোমায় ভালোবেসে যাবো, জনম জমন ওও,,,,"…
সবাই একে একে গাওয়ার পালা শেষ করলে শেষ হাতে থাকা কাগজের টুকরা টা খুলে লিসি
আর তখনই লিসির হাতে আসে — “মায়াবন বিহারিনী হরিণী”
আরোবি তো লিসির পাশে বসে উঁকি মেরে দেখে বলে,, —
"আমার লেখা গানটার নাম তোর হাতেই পরলো,,, "
লিজা—" কি গান পরেছে,, "
জারা লিসির কাছ থেকে নিয়ে পরতে থাকে —
"রবীন্দ্র সংগীত মায়াবন বিহারিনী হরিণী "